তুঘলক শাসন (১৩২০-১৪১৩)

তুঘলক বংশ প্রায় ৯৪ বছর দিল্লি সালতানাতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। এ বংশের তিন জন সুলতানের শাসনামল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে তিন জন শাসক হচ্ছেন-গিয়াসুদ্দীন তুঘলক, মুহাম্মদ বিন তুঘলক ও ফিরোজ শাহ তুঘলক।

সুলতান গিয়াসুদ্দীন তুঘলক (১৩২০-১৩২৫)

সুলতান গিয়াসুদ্দীন তুঘলকের পিতা ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তাঁর পূর্ব নাম ছিল গাজী মালিক। খিলজী শাসনামলে তিনি পাঞ্জাবের শাসনকর্তা ছিলেন। ১৩২০ সালে তিনি খিলজী বংশের অবসান ঘটিয়ে তুঘলক বংশীয় শাসনের গোড়াপত্তন করেন। তাঁর শাসনকাল মাত্র পাঁচ বছর স্থায়ী হয়। তিনি সুশাসক ছিলেন। তিনি পতিত জমিতে শস্য উৎপাদনের জন্য প্রজাদের উৎসাহিত করতেন। জমিতে পানি সেচের জন্য তাঁর নির্দেশে বহু খাল খনন করা হয়েছিল। তিনি অনেকগুলো রাজপথ ও সেতু নির্মাণ করেন। তাঁর সময়ে উশর; উৎপন্ন শস্যের মাত্র এক-দশমাংশ রাজস্ব হিসেবে, আদায় করা হতো। দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য তিনি কর্মচারীদের ভালো বেতন দিতেন। তিনি সুবিচারক, তেজস্বী ও মহানুভব শাসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি বাংলার বিদ্রোহ দমন করে বাংলাকে সাতগাঁও, সোনারগাঁও ও লাক্ষনৌতি-এ তিন ভাগে ভাগ করেন।

গিয়াসুদ্দীন তুঘলকের মৃত্যু

সুলতান গিয়াসুদ্দীন তুঘলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে দিল্লি ফিরে যাচ্ছিলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তাঁর পুত্র জুনা খান দিল্লির উপকণ্ঠে আফগানপুরে একটি কাষ্ঠ নির্মিত গৃহে মঞ্চ তৈরি করেন। হঠাৎ এ গৃহটি ভেঙে পড়ে। সুলতান এ গৃহচাপা পড়ে প্রাণ হারান।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১)

দুর্ঘটনায় গিয়াসুদ্দীন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জুনা খান সুলতান হন এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলক নাম গ্রহণ করেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাশালী। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। গণিত, ইতিহাস, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্ব ছিল। তাঁর হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর। তিনি ধার্মিক এবং ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সংযমী ও সচ্চরিত্রবান ছিলেন

বিভিন্ন পরিকল্পনা

সুলতান হওয়ার পর মুহাম্মদ বিন তুঘলক কতকগুলো পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর, খোরাসান অভিযান, কারাচিল অভিযান, প্রতীক মুদ্রার প্রচলন এবং দোয়াবে কর বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

রাজধানী স্থানান্তর

সুলতান দিল্লি থেকে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। দেবগিরির নতুন নাম রাখা হয় দৌলতাবাদ। দাক্ষিণাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং মোঙ্গল আক্রমণ থেকে রাজধানী নিরাপদ করার জন্য সুলতানের এ উদ্যোগ ছিল যুক্তিযুক্ত। তবে এ সিদ্ধান্তের কারণে রাজকোষের বহু অর্থ খরচ হয়।

খোরাসান অভিযান

সুলতান খোরাসান অভিযানের পরিকল্পনা করেন। সে উদ্দেশে তিনি ৩ লক্ষ ৭০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন, কিন্তু এর বছর এ বাহিনী পোষণের পর তিনি এ পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং সেনাবাহিনী ভেঙে দেন।

দোয়াবে কর বৃদ্ধি

তিনি গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলে প্রচলিত করের হার বৃদ্ধি করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বছর দোয়াব অঞ্চলে ফসল ভালো হয়নি। বর্ধিত হারে কর আদায়ের জন্য সরকারের লোকেরা প্রজাদের উপর জুলুম শুরু করে। প্রজারা বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যেতে থাকে। সুলতানের কানে এ খবর পৌঁছলে সুলতান করের বর্ধিত হার প্রত্যাহার করেন এবং প্রজাদের সাহায্য করার ব্যবস্থা নেন।

সুলতানের মূল্যায়ন

সুলতান ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাশালী। তবে কোনো পরিকল্পনার ভালো-মন্দ উভয় দিক স্থিরচিত্তে বিচার করার মতো ধৈর্য তাঁর ছিল না। তিনি বিরোধিতা সহ্য করতে পারতেন না। তিনি যা ভালো বলে মনে করতেন, তৎক্ষণাৎ তা কার্যকর করতে চাইতেন। সমসাময়িক জনগণ তাঁর পরিকল্পনাগুলো বুঝে ওঠতে পারেনি। তিনি ছিলেন যুগের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর।

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮)

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি তার চাচাতো ভাই ফিরোজকে উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমীর ওমারাদের অনুরোধে ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তাঁর মা ছিলেন হিন্দু রমণী। সুলতান ফিরোজ শান্তিপ্রিয় শাসক ছিলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে দাক্ষিণাত্য স্বাধীন হয়ে যায়। সুলতান ফিরোজ শাহ দাক্ষিণাত্য পুনরুদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করেননি। ১৩৩৮ সালে বাংলাও স্বাধীন হয়ে যায়। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এবং তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহের সময় বাংলা পুনর্দখলের জন্য ফিরোজ শাহ দু’বার অভিযান চালান, কিন্তু তাঁর কোনো অভিযানই সফল হয়নি। তিনি শুধু সিন্ধুর বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন। তবে এ জন্য তাঁর প্রচুর জনবল ও অর্থ ক্ষতি হয়। তিনি ইসলামের উদারনীতি

গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আলেমগণকে নিয়োজিত করেন। তিনি অন্য ধর্মাবলম্বীর উপর অত্যাচার করাকে ঘৃণা করতেন।

শাসনব্যবস্থা

ফিরোজ শাহ খুব প্রজাদরদী শাসক ছিলেন। তিনি প্রজাদের করের বোঝা লাঘব করেন। কৃষির উন্নতির জন্য সেচব্যবস্থা সম্প্রসারিত করেন। তাঁর সময়ে যমুনা নদী থেকে কাটা একটি খাল এখনও ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কর্ণাল ও হিসাব অঞ্চলে সেচের সীজনে পানি সরবরাহ করে। তিনি ফৌজদারি দণ্ডবিধি সংশোধন করেন। তিনি একজন বড় নির্মাতা এবং শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অনাথ, এতিম ও দুস্থদের মধ্যে তিনি প্রচুর অর্থ বিতরণ করতেন। ১৩৮৮ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলকের মৃত্যু হয়।

উত্তরাধিকারীগণ

ফিরোজ শাহ তুঘলকের মৃত্যুর পর শাসন ব্যবস্থা শিথিল হয়ে যায়। ফিরোজের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৩৮৮ থেকে ১৩৯৮ সাল পর্যন্ত পর পর ছয়জন সুলতান সিংহাসনে বসেন। এ বংশের শেষ সুলতান মাহমুদ শাহের সময় বিখ্যাত তুর্কি বীর তৈমুর লঙ ভারত আক্রমণ করেন।

তৈমুর ছিলেন মধ্য এশিয়ার সমরকন্দের অধিপতি। শৈশবে একটি পা খোঁড়া হয়ে যায় বলে তিনি তৈমুর লঙ নামে অভিহিত হন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি চুঘতাই তুর্কি সম্প্রদায়ের নেতা হন। মধ্য এশিয়ায় বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনের পর ১৩৯৮ সালে তিনি ভারত অভিযান করেন। তৈমুরকে বাধাদানের কোনো ক্ষমতা দুর্বল মাহমুদ শাহের ছিল না। তৈমুর প্রায় বিনা বাধায় দিল্লিতে প্রবেশ করেন। প্রায় তিন মাস অবস্থান করার পর তিনি স্বদেশে ফিরে যান। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি খিজির খানকে লাহোর ও মুলতানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে যান। তৈমুরের আক্রমণের ফলে উত্তর ভারতে দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ আক্রমণের ফলে তুঘলক বংশ একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ে। তৈমুর চলে যাওয়ার পর ১৪১৩ সালে মাহমুদ শাহ দিল্লির শাসন ক্ষমতা ফিরে পেলেও তা দিল্লি ও তার আশপাশে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ১৪১৩ সালে মাহমুদ শাহের মৃত্যুর সাথে সাথে তুঘলক বংশের সমাপ্তি ঘটে।

সৈয়দ বংশ

১৪১৪ থেকে ১৪৫১ সাল পর্যন্ত খিজির খান ও তার বংশধরেরা শাসন করেন। খিজির খানের প্রতিষ্ঠিত বংশ উপমহাদেশের ইতিহাসে সৈয়দ বংশ নামে। পরিচিত।

লোদী বংশ

১৪৫১ সালে সৈয়দ বংশের অবসান ঘটিয়ে বাহলুল লোদী নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসনামলে একমাত্র লোদী বংশের শাসকরাই ছিলেন পাঠান বা আফগান। ১৪৫১ থেকে ১৫৬২ সাল পর্যন্ত এ বংশের শাসন বজায় থাকে। বাহলুল লোদী, সিকান্দার লোদী ও ইবরাহিম লোদী ছিলেন এ বংশের পরপর তিন জন শাসক। ইবরাহিম লোদীর শাসনামলে মুগল আক্রমণ ঘটে। এ আক্রমণের নেতা ছিলেন তৈমুর লঙের বংশধর জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর। ১৫২৬ সালে বাবর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদীকে পরাজিত ও নিহত করেন। অতঃপর তিনি এ দেশে রাজ্য স্থাপন করে স্থায়ীভাবে থেকে যান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বংশের নাম মুগল বংশ। এভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সুলতানী শাসনের অবসান এবং মুগল শাসনের সূচনা হয়।

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!