হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী

হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর জন্ম

রবিউল আউয়াল মাস। শীতের অবসান প্রায়, তরু শাখা-প্রশাখায় নব পত্র-পল্লব প্রায় সমাগত। এমন এক দিনে রাতের শেষ প্রহরে হালকা শীতের জিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। পবিত্র মক্কা নগরীর উঁচু-নিচু ভূমিতে প্রভাতী আলোক শিখা ভাগনী, ব নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক এমন শুভ মুহূর্তে আরবের মরু-দিগন্তে মক্কা নগরীর এক জীর্ণ কুটিরের এক নিভৃত কক্ষে বিবি আমিনা সুখ-স্বপ্ন দৃষ্টে বিভোর। তিনি দেখছিলেন এক অপূর্ণ নূরে আসমান-জমিন আলোকিত হয়ে গেছে। কার যেন আজ শুভাগমনী, কার যেন আজ অভিনন্দন! কুল মাখলুকাত (সৃষ্ট সব কিছু) আজ আনন্দে আত্মহারা। গগনে গগনে ফেরেশতারা ছুটাছুটি করছেন। তোরণে তোরণে বাঁশি বাজছে। সবাই আজ বিস্মিত, পুলকিত, কম্পিত শিহরিত । জড়-প্রকৃতির অন্তরেও আজ দোলা লাগছে। …
 
বিবি আমিনার কুটিরেই আজ কি অপরূপ দৃশ্য। কারা এই শুভ্রবাসন পূণ্যময়ী রমণী? বিবি হাওয়া, বিবি হাজেরা, বিবি আসিয়া, বিবি রহিমা, বিবি মরিয়ম, সবাই আজ আমিনার শিয়রে দণ্ডায়মান। বেহেশতী নূরে সারাঘর আজ নূরান্বিত, বেহেশতী খুশবুতে বাতাস আজ সুরভিত। এক স্নিগ্ধ শান্ত আমেজের মধ্য দিয়ে আমিনার স্বপ্ন ভাঙলো। এমন শুভ মুহূর্তে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার সোবহে সাদেকের সময় দুনিয়াতে শুভাগমন করলেন।
 
তিনি সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত হয়ে পৃথিবীতে শুভাগমন করেছিলেন। জন্মগতভাবেই তাঁর মুসলমানী করা ছিল; এবং হযরত জিব্রাইল (আঃ) নিজে তাঁর নাড়ী কেটেছিলেন। 
সেই সময় মক্কার আবহাওয়া নবজাত শিশুদের জন্যে অস্বাস্থ্যকর ছিল। সেজন্য নগরীর গণ্যমান্য ব্যক্তি তাদের শিশুদের লালন পালনের দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন দুগ্ধবর্তী বেদুঈন যাত্রীদের হাতে। হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর জন্মের কিছুদিন পর যদি সাদ গোত্রের প্রায় বার জন মহিলা মক্কায় উপস্থিত হলেন দুগ্ধপোষ্য শিশুদের খোঁজে। এদেরই একজনের ওপর মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত হলো আল্লাহ’র রাসূল (সঃ)-কে দুধ খাওয়ানোর। তিনি হলেন বিবি হালিমা। যার নামের অর্থ ‘ভদ্র’।

বনি সাদ গোত্রে মোহাম্মদ (সঃ)-এর শিশুকাল

হালিমা বিনতে যুইব বলেনঃ

“বছরটা ছিল ঘোর অন্ধকার। আমি এবং আমার স্বামী হারিস বিন আবদুল দু’জনেই মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। আমরা ঠিক করলাম, মক্কায় গিয়ে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু খুঁজে বের করবো। আমরা আরো মনে করলাম হয়তো এমন একটি শিশু পেয়ে যাব, যার কৃতজ্ঞ পিতা-মাতা আমাদের কঠিন অভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবেন। আমরা একটি কাফেলায় শরীক হলাম, যেখানে আমাদের গোত্রের অনেক মহিলা ছিলেন যারা একই উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেছিলেন।
 
আমি যে গাধার পিঠে সওয়ার হয়েছিলাম সেটা এতো শীর্ণকায় ছিল এবং ক্লান্তিতে এতো দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তার রাস্তায় পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হলো। আমার বাচ্চা সারারাত ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছিল, তাই আমরা সেই রাতে একদম ঘুমোতে পারিনি। তার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার মত এক ফোঁটা দুখও আমার বুকে ছিল না।
 
আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। আমি ভাবলাম, আমাদের এই কষ্টের অবস্থায় আমি কি কোন দুগ্ধপোষ্য শিশু পাবো?
 
কাফেলার অনেক পরে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। এর মধ্যে অন্যান্য দুগ্ধবতী সব মহিলারা নবজাতকের লালন-পালনের দায়িত্ব পেয়ে গেছেন। কেবল একটি শিশু ছাড়া এবং সেই শিশুটি ছিল হযরত মোহাম্মদ (সঃ)।
 
হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর পিতা বেঁচে ছিলেন না। তাঁর পরিবার উচ্চ বংশীয় হলেও ধনী ছিলেন না। সেজন্যে কোন ধাত্রী শিশুটিকে নিতে আগ্রহী ছিল না। আমরা প্রথমে ঠিক করেছিলাম খালি হাতেই ফিরে যাব। কিন্তু আমি এই ভেবে চিন্তিত ছিলাম যে, খালি হাতে ফিরে গেলে আমার চেয়ে ভাগ্যবতীরা আমাকে বিদ্রূপ করবে। তাছাড়া সুন্দর শিশুটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো মক্কা নগরীর অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় সে শুকিয়ে ঝরে যাবে।
 
আমার মনে শিশুটির প্রতি এক গভীর মমতা জেগে উঠলো। আমি তখন অনুভব করলাম, অলৌকিকভাবে আমার স্তন স্ফীত হয়ে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে! আমি আমার স্বামীকে বললাম, ‘আমি আল্লাহ্ র নামে শপথ করে বলছি, আমার এই শিশুটিকে নিতে বড়ই ইচ্ছে করছে, যদিও এর থেকে আমাদের তেমন কিছু পাবার নেই।’ আমার স্বামী বললেন, ‘আমার মনে হয় না যে তুমি ভুল বলছো। হয়তো এই শিশুটির কারণে আমাদের ওপর একাধিকবার আল্লাহ’র রহমত নাজিল হতে পারে।
 
নিজেকে সংযত করতে না পেরে আমি সুদর্শন ঘুমন্ত শিশুটির দিকে দৌড়ে গেলাম। যখন আমি শিশুটির সুন্দর ছোট বুকে হাত রাখলাম, তখন সে চোখ খুলে হাসলো। তার চোখ থেকে বিচ্ছুরিত হচিছল আলো। আমি তার ভ্রূর মাঝে চুমু খেলাম। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আমি আমাদের কাফেলা যেখানে তাঁবু খাটিয়েছিল সেখানে ফিরে গেলাম। আমি আমার ডান স্তন তার মুখে তুলে দিলাম। অবাক হয়ে আমি দেখলাম, সে তার ক্ষুধা নিবারণের মতো যথেষ্ট দুধ পান করতে পারলো। আমি আবার আমার বাম স্তন তার মুখে তুলে দিলাম। কিন্তু সে সেটা না নিয়ে তার দুধ-ভাইয়ের জন্যে রাখলো। সে সবসময়ই এরকম করতো।
 
আরো একটা বড় ধরনের বিস্ময় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। সকাল থেকে যে উটের বাঁটে দুধ ছিল না সেই বাঁটগুলো দুধে ভর্তি হয়ে গেলো। সেগুলো থেকে আমার স্বামী দুগ্ধ দোহন করলেন এবং তা আমরা পরম তৃপ্তি সহকারে পান করলাম। কয়েকমাস পরে রাত্রের ছায়ায় এই প্রথম আমাদের ভালো ঘুম হলো। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে আমার স্বামী বললেন, ‘হালিমা তুমি এক অসাধারণ আশীর্বাদপ্রাপ্ত শিশুকে পোষ্যরূপে গ্রহণ করেছ।
 
শিশুটিকে নিয়ে আমি আমার গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। গাধাটি দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা কাফেলাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো। আমার সহযাত্রীণীরা বলতে লাগলো, ‘হালিমা! একটু দাঁড়াও যাতে আমরা একসাথে বাড়ি ফিরতে পারি। এটা কি সেই গাধা নয় যেটার পিঠে চড়ে তুমি এসেছিলে?? আমি তাদেরকে বললাম, হ্যাঁ সেটাই তো।’ তখন তারা অবাক হলো, আর বলাবলি করতে লাগলো গাধাটির ওপর এমন কিছুর আছর হয়েছে যার সম্পর্কে তারা কোন ধারণা করতে অক্ষম।
 
শেষ পর্যন্ত বনি সাদ গোত্রে আমরা নিজ নিজ ঘরে পৌঁছলাম। আমাদের মত খরা-পীড়িত এলাকা পৃথিবীর আর কোথাও ছিল বলে আমার জানা ছিল না।
 
আমাদের পশুর পাল দুর্ভিক্ষে কাবু হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নিজ বাড়ি ফিরে বিস্মিত হলাম যে, অন্যান্য ভাল মৌসুমের চেয়ে আমাদের ভেড়ীগুলো সতেজ হয়ে উঠেছে এবং তাদের স্তন দুধে এমনই স্ফীত হয়ে উঠেছে যা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু আমাদের আশেপাশের পশুপালের অবস্থা ছিল শোচনীয় এবং সেজন্যে মালিকগণ নিজ রাখালদের দোষারোপ করতে লাগল। তারা রাখালদের গালি দিয়ে বলতে লাগল, ‘তোরা নিপাত যা তারা আরও বলল, ‘হালিমার ভেড়াগুলো যেখানে চরে সেখানে আমাদের ভেড়াগুলো চরাতে পারিস না?”
 
রাখালরা নির্দেশ মোতাবেক কাজ করলো। কিন্তু তাতে কোন ফল হল না। যে মাটি থেকে কচি ঘাসগুলো গজিয়ে উঠেছিল সেগুলো আবার ঐ মাটিতে মিশে গেল।
 
আমাদের বাড়ি-ঘর কল্যাণ ও প্রাচুর্যে ভরে উঠতে লাগল। শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এর বয়স যখন দু’বছর হলো তখন আমি তাকে দুধ ছাড়িয়ে দিলাম। তার হাবভাবে সত্যিকার অসাধারণত্ব প্রকাশ পেল। মাত্র নয় মাস বয়সে শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এত সুন্দর স্বরে কথা বলতো যে তা সবার হৃদয় স্পর্শ করতো। সে কখনও নোংরা থাকতো না এবং কখনও ফুঁফিয়ে বা চিৎকার করে কাঁদতোও गा. – দৈবাৎ তার বিবস্ত্র অবস্থা ব্যতীত, যদি কখনও রাতে সে অস্থির হয়ে উঠতো এবং ঘুমাতে চাইতো না তখন আমি তাকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে আসতাম। সে তখনই আকাশের তারকারাজির দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকতো। সে ভীষণ আনন্দিত হয়ে উঠতো এবং যখন দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো তখন সে চোখবুজে ঘুমিয়ে যেত।”
 
যখন তাকে দুধ ছাড়ানো হলো, হালিমা প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিল। মা তাকে পাওয়ার জন্যে উদ্গ্রীব ছিলেন। এ বিরহ-অভাগিনী ধাত্রী-মাতার জন্যে ছিল অসহনীয়। এই বিচ্ছেদ তাঁর কাছে বড়ই বেদনাদায়ক হয়ে দেখা দিয়েছিল। মক্কা নগরীতে পৌঁছামাত্র হালিমা বিবি আমিনার পায়ে পড়ে মিনতি জানিয়ে বললেন, “দেখুন, বাদিয়ার আলো বাতাসে আপনার বাচ্চা কি রকম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছে। এখন যেহেতু সে হাঁটতে শিখেছে বাদিয়ায় থাকলে সেটা ওর জন্যে আরো ভালো হতো। মক্কার আলো-বাতাস এখন স্বাস্থ্যের জন্যে বড়ই মারাত্মক। আপনার চোখের সামনে সে শুকিয়ে যাবে আর আপনি ভাববেন, আমি কি বলছিলাম তখন-তো অনেক দেরি হয়ে যাবে!”
 
এত মিনতি এবং তাঁর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বিবি আমিনা শিশু মোহাম্মদ (সঃ) কে হালিমার সংগে আবার বাদিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর করুণাময়ী ধাত্রী-মা তাকে নিরাপদে কোলে জড়িয়ে ধরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার জন্যে পথে পা রাখলেন।
 
শিশু মোহাম্মদ (স)-কে সংগে নিয়ে বাদিয়ায় নিজ বাড়িতে হালিমা ফিরে এলেন। এখানে জীর্ণ মরুপ্রান্তরে ঢেউ খেলানো বালুর কার্পেটে মোহাম্মদ (সঃ)-এর প্রথম পদচিহ্ন‍ অংকিত হল। এ মরুপ্রান্তরে সে আনন্দের সংগে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে লাগল। পাহাড় থেকে ভেসে আসা বাতাসের সুগন্ধকে সে তাঁর নাসারন্ধে স্বাগত জানান এবং এই প্রান্তর-ভূমিতে সে নক্ষত্র খচিত আকাশের গভীর নীল তাঁবুর নিচে শুয়ে ঘুমিয়ে গেল। মরুভূমির রাত্রির নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে তাঁর বক্ষদেশ স্ফীত হয়ে উঠলো। যাযাবরদের পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে সে সুপুষ্ট হয়ে বেড়ে উঠতে লাগল। তাঁর খাদ্য তালিকায় ছিল দুধ, পনির, সেঁকা রুটি, উট ও ভেড়ার গোসত।
 
এই পরিবেশ তাঁকে দৈহিক ও আত্মিক শক্তি যুগিয়েছিল যা পরবর্তী জীবনে বহু কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে তাঁকে অনেক সাহায্য করেছিল। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) পরম আনন্দে তাঁর ছোটবেলার কথা স্মরণ করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আল্লাহপাক আমাকে দু’টি অমূল্য নেয়ামত দান করেছেন যার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে মক্কায় সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশে জন্মানো, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সমগ্র হিযায়ের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর অঞ্চল বনি সাদে প্রতিপালিত হওয়া।”
 
যখন তিনি অন্যান্য যাযাবর বালকদের দলে মিশে পাহাড়ের উপরে চড়ে ভেড়া চরানোর দৃশ্যাবলী দেখতেন, সেই সব দৃশ্যাবলী তাঁর মন থেকে কখনও মুছে যেত না। যদিও তিনি চিন্তা ভাবনা করতে বেশি পছন্দ করতেন তবুও তিনি তাঁর সমবয়সী দুরন্ত বেদুঈন বালকদের সাথে কখনও একমত পোষণ করতেন না। তিনি ঐসব বালকদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গোপনে তাবুর নিকটবর্তী নির্জন স্থানে বসে চিন্তামগ্ন থাকতেন।….
 
 

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!