পীর দুদু মিয়া (রহ.) (১৮৪০-১৮৬২)

পীর মহসিন উদ্দীন দুদু মিয়া ১৮১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বার বছর বয়সে তিনি শিক্ষালাভের জন্য মক্কা শরীফ গমন করেন। পাঁচ বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ সাংগঠনিক গুণের অধিকারী। তিনি ফরায়েজীদের সংঘবদ্ধ ও সুসংহত করে তাদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগরিত করেন। জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তিনি এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন।

তিনি ফরায়েজীদের নিয়ে এক বিরাট প্রজা আন্দোলন শুরু করেন। সংগঠনের সুবিধার্থে তিনি বাংলাদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য এক একজন করে ‘খলীফা’ নিযুক্ত করেন। ফরায়েজীদের মধ্যে ঐক্য সংহতি বৃদ্ধি, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ, কূটনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগ ইত্যাদি খলীফাদের কাজ ছিল। নিজ নিজ অঞ্চলের সব খবরাখবর পীর দুদু মিয়াকে নিয়মিত ভাবে জানানো ছিল খলীফাদের অপর একটি কর্তব্য।

পীর মহসিন উদ্দীন দুদু মিয়া (রহ.) জমিদার ও নীলকরদের দ্বারা অত্যাচারিত কৃষক, শ্রমিক, কারিগর প্রভৃতি শ্রেণির মানুষকে সংঘবদ্ধ করেন। তিনি তাঁর পিতার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারকে বৈপ্লবিক স্তরে উন্নীত করেন। তাঁর কর্মসূচি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। ফলে এ আন্দোলনের গুণগত পরিবর্তন ঘটে। তিনি ঢাকা, পাবনা, যশোর, মালদহ, বারাসাত প্রভৃতি অঞ্চলে অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। এর ফলে জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকার সম্মিলিতভাবে পীর দুদু মিয়ার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গঠন করে। ১৮৪৭ সালে তিনি এ সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ সংগ্রাম দমনে ব্যর্থ হয়ে সরকার পীর দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে। ১৮৬০ সালে তাঁকে জেল থকে মুক্তি দেয়া হয়।

ফরায়েজী আন্দোলন প্রথমে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এটা শুধু মুসলমান জনগণকে সংঘবদ্ধ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেনি; বরং আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি স্থানীয় হিন্দু কৃষকদের এক বিরাট অংশকেও উদ্বুদ্ধ করে এবং ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে। এভাবে এ আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

ইংরেজ খেদাও আন্দোলন

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব উপমহাদেশের ইতিহাসে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের আযাদীর জন্য এটা প্রথম সংগ্রাম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একশ’ বছরের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে এ ছিল এক মহাবিদ্রোহ। তার আগে সংঘটিত ফকির আন্দোলন, শহীদ তিতুমীরের সংগ্রাম, ফরায়েজী আন্দোলন ইত্যাদি আন্দোলন সর্বভারতীয় রূপ নিতে পারেনি।

জনগণের সমর্থনপুষ্ট সিপাহীদের এ মহাবিদ্রোহ ছিল দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটানো ছিল এ মহাবিদ্রোহের উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়।

রাজনৈতিক কারণ

ইংরেজ কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে উপমহাদেশের সকল শ্রেণির জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। লর্ড ডালহৌসীর স্বত্ব বিলোপ নীতির ফলে সাতারা, নাগপুর, ঝাঁসি, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। এসব রাজ্যের রাজপরিবার, তাঁদের কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ইংরেজবিরোধী মনোভাব প্রবল হয়ে ওঠে।

অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ ক্ষমতাচ্যুত হলে তাঁর প্রজাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। কানপুরের নানা সাহেবের বৃত্তি বন্ধ করে দেয়া হয়। একে একে মুসলিম ও হিন্দু রাজ্যের বিলোপ, উপাধিলোপ, বৃত্তিলোপ, ভারতীয়দের উচ্চ রাজপদ থেকে বিতাড়ন, সম্রাট বাহাদুর শাহকে পৈতৃক রাজপ্রাসাদ থেকে অপসারণ ইত্যাদির কার্যকলাপ উপমহাদেশের জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। দেশীয় রাজা, সিপাহী ও জনসাধারণ সবাই ইংরেজদের দুঃশাসন থেকে মুক্তির সুযোগ খুঁজতে থাকে। ঝাঁসির রাণী ও নানা সাহেব এ সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন।

অর্থনৈতিক কারণ

ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে উপমহাদেশের কুটির শিল্প ধ্বংস এবং অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বহু জমিদার জমির মালিকানা লাভ করলেও সূর্যাস্ত আইন তাদের সর্বনাশ করে। সরকার কর্তৃক বহু লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। অনেক কৃষক ও বণিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোম্পানির কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতির ফলে সাধারণ মানুষও অসন্তুষ্ট হয়।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ এ অবস্থার প্রতিকারের প্রত্যাশায় মহাবিদ্রোহে যোগ দেয়। দেশীয় সিপাহী ও ইংরেজ সিপাহীদের মধ্যে বেতনের অন্যায় বৈষম্যের কারণেও দেশীয় সিপাহীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ সিপাহী বিপ্লবের নেপথ্যে ছিলেন স্বাধীনতাকামী আলেম সমাজ।

সামাজিক কারণ

ব্রিটিশ সরকারের সক্রিয় সংস্কারনীতি সনাতন হিন্দুদের মনে তীব্র আঘাত দেয় এবং কোম্পানির শাসনের প্রতি তাদের মনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ জন্ম দেয়। দেশীয় সৈন্যদের নিম্ন বেতন তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছিল। ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রবর্তনের ফলে মুসলমানদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এসব পরিস্থিতি ভারতীয়দের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং মহাবিদ্রোহের মূলে রসদ জোগায়।

ধর্মীয় কারণ

ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রকাশ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করে। ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মসজিদ-মন্দিরের খাস জমির উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে ইংরেজ সরকার হিন্দু মুসলমানদের মনে ভীষণ আঘাত হানে। ১৮৫০ সালে আইন পাস করে ধর্মান্তরকারীদের পৈতৃক সম্পত্তি লাভ করার অধিকার প্রদান করা হয়। এসব কারণে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের অসন্তোষ তীব্রতর হতে থাকে।

প্রত্যক্ষ কারণ

১৮৫৬ সালে ‘এনফিল্ড’ নামে এক প্রকার বন্দুকের ব্যবহার চালু করা হয়। এ বন্দুকের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ব্যবহার করতে হতো। গুজব রটে, এ কার্তুজ শূকর ও গরুর চর্বি দিয়ে তৈরি। হিন্দুরা গরুকে দেবতা মনে করে আর মুসলমানরা শূকরকে হারাম মনে করে। ফলে হিন্দু-মুসলমান কেউই এ কার্তুজ ব্যবহার করতে সম্মত হয়নি। হিন্দু মুসলমান সিপাহীদের মনে বদ্ধমূল হয়েছিল যে, তাদের ধর্ম বিনষ্ট করে দেয়ার জন্য ইংরেজ সরকার এ কার্তুজ প্রচলন করে। এ কারণে সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহ আরম্ভ হয়। এবং দেশময় স্বাধীনতার সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে।

সংগ্রামের বিস্তার

সংগ্রাম শুরু হয় বাংলায়। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ বাংলার ব্যারাকপুরে সংগ্রাম শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বহরমপুরসহ বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহ বিপ্লব ক্রমে মীরাঠ, লক্ষ্মৌ, কানপুর, ঝাঁসি, বেরেলী, অযোধ্যা, রোহিলাখণ্ড প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। গোয়ালিয়র, হায়দারাবাদ, পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্য এ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি; বরং তারা ইংরেজদের সহযোগিতা করেছিল।

এ সংগ্রাম সিপাহীদের বিদ্রোহ দিয়ে শুরু হলেও এর পেছনে জনসাধারণের সমর্থন ছিল। এটা রাজনৈতিক স্বাধীনতারও সংগ্রাম ছিল। সেনাবাহিনীর বাইরে জনসাধারণের মধ্যেও আন্দোলন, সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে এ সংগ্রাম ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতে ইংরেজ শাসনের ভিত নড়ে ওঠে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয়দের এ স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যর্থ হয়। এ সংগ্রাম কেন্দ্রীয় সুযোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত হয়নি। উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। বিদ্রোহীরা বহু স্থানে জনসাধারণের সহানুভূতি ও সমর্থন হতে বঞ্চিত ছিল। বিদ্রোহীদের চেয়ে ইংরেজ সেনাবাহিনী অধিক সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল।

আপাতত এ সংগ্রাম ব্যর্থ হলেও পরবর্তীকালের সকল সংগ্রামের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের এ ব‍্যাপক সংগ্রাম স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। ১৮৫৭ সালে স্বাধীনতালাভের দুর্বার এ প্রচেষ্টা ১৯৪৭ সালে বাস্তবে রূপ লাভ করে।

সংগ্রামের ফলাফল

এ সংগ্রাম ব্যর্থ হলেও এটা ভারতের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে। এ সংগ্রামের ফলে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে। ভারত সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীনে চলে যায়। ১৮৫৭ সালে ভারত শাসনের জন্য নতুন আইন পাস হয়। গভর্নর জেনারেল ভাইসরয় উপাধিতে ভূষিত হন। ‘ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট’ দ্বারা ভারতীয়দের জন্য সরকারি উচ্চপদ সংরক্ষিত হয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, এ সংগ্রাম ছিল দেশপ্রেম ও আত্মদানের প্রথম প্রেরণা।

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!