পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম

লাহোর প্রস্তাব

মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমান স্বার্থরক্ষার সংগ্রাম জোরদার হতে থাকে। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের সমাজের অধীনে ১৯৩৭ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী বাংলা ও পাঞ্জাবে মুসলিম লীগ বহুদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করে। বাংলায় কৃষক-প্রজা পার্টির নেতা শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। অন্যান্য প্রদেশে কংগ্রেসের একক মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। (কংগ্রেস) ও ‘মুসলিম লীগ’ একত্রে মন্ত্রিসভা গঠন করতে ব্যর্থ হয়। পারস্পরিক অবিশ্বাসও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধে। এতে বহু লোক প্রাণ হারায়। ফলে মুসলমানদের মধ্যে এ উপলব্ধি বাড়তে থাকে যে, কংগ্রেস শাসনে তাদের আলাদা সত্তা রক্ষা এবং অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা থাকবে না। নিজস্ব সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার চিন্তা জোরদার হতে থাকে।

পৃথক আবাসভূমির দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ব্যাপকসংখ্যক মুসলমান সংঘবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগ নেতা ঘোষণা করেন যে, হিন্দু ও মুসলমান দু’টি আলাদা জাতি। তাঁর এ ঘোষণা ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব থিওরী নামে পরিচিত। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এ সভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটি লাহোর প্রস্তাব নামে পরিচিত। এ প্রস্তাবে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহে মুসলমানদের জন্য একাধিক পৃথক রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিকসহ অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থরক্ষা করা হবে। এ জন্য তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে শাসনতন্ত্রে উপযুক্ত, কার্যকর ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচ রাখা হবে। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের জন্যও অনুরূপ রক্ষাকবচ রাখতে

হবে।

লাহোর প্রস্তাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বীকৃতি ছিল কিন্তু পরে ১৯৪৬ সালে দিল্লির মুসলিম লীগ কনভেনশনে একাধিক রাষ্ট্রের স্থলে পাকিস্তান নামক একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম

লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের জন্য “মুসলিম লীগ” তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করে। অন্য দিকে কংগ্রেস স্বাধীন ভারতের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এটলী ১৯৪৬ সালে ভারছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেন। মুসলিম লীগের জন্য এ নির্বাচন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা মুসলিম লীগের জন্য অপরিহার্য। নির্বাচনে মুসলিম লীগ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। নির্বাচনের পর গর্ভ পেশির লরেন্সের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট ব্রটিশ মন্ত্রিসভার এক প্রতিনিধিদল ভারতে আসেন। একেই কেবিনেট মিশন বলা হয়।

কেবিনেট মিশনের পরিকল্পনায় তিন গ্রুপে বিন্যস্ত প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্য নিয়ে ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়। তার বিরোধিতা করে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। মুসলিম লীগ এ পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং সরকারে যোগ দিতে সম্মত হয়, কিন্তু বড় লাট তাতে রাজি হননি। পরে কংগ্রেস সরকার গঠনে সম্মত হলে বড় লাট ওয়াভেল কংগ্রেস নেতা নেহরুকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। প্রতিবাদে মুসলিম লীগ কংগ্রেসের সরকার গঠনের দিন, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করে। একে কেন্দ্র করে কলকাতায় এক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়। এ দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ফলে কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

অবস্থার ক্রমাবনতিতে নবনিযুক্ত বড় লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে মীমাংসার প্রচেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করার শর্তে ভারত উপমহাদেশ বিভাগে রাজি হয়। মুসলিম লীগও তা মেনে নেয়। এর ভিত্তিতে ভারতে শেষ ইংরেজ বড় লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ৩ জুন ক্ষমত হস্তান্তরের পরিকল্পনা পেশ করেন।

১. এ পরিকল্পনায় ভারত উপমহাদেশকে বিভক্ত করে পাকিস্তান ও ভারত ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

২. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের আইনসভা ভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে বা ভারতে যোগ দেবে বলে স্থির হয়।

৩. পাঞ্জাব ও বাংলা কিভাবে বিভক্ত হবে তা নির্ণয়ের ভার সীমানা কমিশনকে দেওয়া হয়। ৪. উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিলেট জেলা গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তান বা ভারতেযোগদানের সিদ্ধান্ত নেবে।

এ পকিল্পনার ভিত্তিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ভারত স্বাধীনতা আইন প্রণয়ন করে। ফলে ১৯০ বছর ইংরেজ শাসনের পর উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত ইউনিয়ন গঠিত হয়।

পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশী উলামায়ে কেরাম সুদীর্ঘকাল ইংরেজ শাসনে থাকার তিক্ত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পৃথক আবাসভূমি ব্যতিরেকে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব নয়। অতএব, এ উদ্দেশেই ভারতের মহান জ্ঞান-তাপস হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) দ্বারা অনুপ্রাণিত হযরত মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠিত হয়। পূর্বে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর নেতৃত্বে উলামায়ে কেরামের যে বিশাল বাহিনী স্বাধীনতা আন্দোলন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠিত হওয়ার পর তাদের অনেকেই জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ত্যাগ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগদান করেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মাওলানা শিব্বীর আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে সমগ্র উপমহাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশে জনমত গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান। তারা সমগ্র উপমহাদেশে জমিয়তের সংগঠন কায়েম করে দেশের আনাচে-কানাচে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন। মুসলিম জনপদের সর্বত্র ধ্বনিত হয় ‘লড়কে লেংগে পাকিস্তান।’ কোটি কোটি মানুষের গগনবিদারী কণ্ঠের এ আযাদী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সারা ভারতবর্ষ। স্বাধীন পাকিস্তান লাভের জন্য বজ্রকঠিন শপথ গ্রহণ করে আবাল বৃদ্ধ বনিতা অনেকেই। বলা বাহুল্য, মুসলমানদের এ অভাবনীয় জাগরণের পেছনে বাংলার উলামায়ে কিরামের অবদানই সর্বাধিক। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠিত হওয়ার পর এর পতাকাতলে অসীম মনোবল ও সাহস নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন ফুরফুরার প্রসিদ্ধ পীর, বাংলার নয়নমণি হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দীক (রহ.) এবং তাঁরই বিশেষ খলীফা পূর্ব বাংলার প্রখ্যাত পীর ছারছীনার হযরত মাওলানা নেছারুদ্দীন (রহ.)। স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর সেনানী হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর পৌত্র আবু খালিদ মুহাম্মদ রশীদুদ্দীন আহমাদ (পীর বাদশা মিঞা)। তিনিও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ঝাণ্ডাতলে সমবেত হয়েই পাকিস্তান আন্দোলন তীব্রতর করেন। এ ছাড়া হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর খলীফা, দারুল উলূম দেওবন্দের কৃতী সন্তান, বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহ.), সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহান সাধক মোজাহেদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.), হযরত মাওলানা আবদুল্লাহ আল কাফী (রহ.), হযরত মাওলানা মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান (রহ.), হযরত মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমী (রহ.), হযরত মাওলানা সিদ্দীক আহমাদ চাটগামী (রহ.), হযরত মাওলানা মুসলেহুদ্দীন (রহ.) ও অন্যান্য প্রখ্যাত উলামায়ে কেরামের অবদান অবিস্মরণীয়। বাংলার এসব কৃতী সন্তানের ডাকে স্বীয় – জানমাল, ইজ্জত-আবরু বিসর্জন দিয়ে সেদিন মুসলিম জনসাধারণ পৃথক স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য উত্তাল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উলামায়ে কেরাম জোরালো ভূমিকা পালন না করলে শুধু মুসলিম লীগের পক্ষে জনমত গঠন করে পাকিস্তান কায়েম করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট স্বাধীন ও সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সে পথ ধরেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রকৃতপক্ষে সংগ্রামরত হক্কানী উলামায়ে কেরামেরই অনস্বীকার্য অবদান।

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!