মুঘল শাসন (১৫২৬-১৫৪০)

জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০)

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে জহিরুউদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের সামরিক বিজয় ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। তিনি ভারতে সালতানাতের অবসান ঘটিয়ে মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। বাবর রুশ-তুর্কিস্তানের ফারগানা রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার দিক থেকে তৈমুর লঙ এবং মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। বাবর তুর্কি শব্দ। এর অর্থ সিংহ। বাবর তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছেন। বাস্তব জীবনে তিনি সিংহের মতো সাহস ও তেজস্বিতা দেখিয়ে গেছেন। সম্রাট বাবর ছিলেন প্রকৃত একজন সুন্নী মুসলিম। তিনি ছিলেন ইসলামের একনিষ্ঠ ভক্ত। তবে তিনি অন্য ধর্মের ব্যাপারে ছিলেন উদার ও সহনশীল।

বাবরের বাল্যজীবন

বাবরের পিতার নাম ওমর শেখ মির্জা। তিনি ছিলেন ফারগানার অধিপতি। বাবরের বয়স যখন মাত্র ১১ বছর তখন তাঁর পিতা মারা যান। এ অল্প বয়সেই তিনি ফারগানার সিংহাসনে বসেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিনি দক্ষতার সঙ্গে সেসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন এবং মাত্র ১৪ বছর বয়সে সমরকন্দ দখল করেন, কিন্তু সমরকন্দ জয়ের সময় আত্মীয়দের ষড়যন্ত্রে তিনি ফারগানার কর্তৃত্ব হারান। তিনি ফারগানার বিদ্রোহ দমন করতে গেলে সমরকন্দও তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। কিছুদিন বাবরকে রাজ্যহারা, আশ্রয়হারা অবস্থায় ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে হয়। প্রথম জীবনের দুঃখ-কষ্ট বাবরকে পরবর্তী জীবনের জন্য উপযোগী করে তুলেছিল।

বাবরের কাবুল দখল

এ সময় কাবুলের সিংহাসন নিয়ে গোলযোগ দেখা দেয়। বাবর অল্পসংখকে সৈন্যের সহায়তায় ১৫০৪ সালে কাবুল জয় করেন এবং কাবুলের আমীর হন।

ভারত অভিযান

বাবর ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর মনে ভারত জয়ের ইচ্ছা জাগে। তখন দিল্লির সিংহাসনে ছিলেন ইবরাহিম লোদী। তাঁর শাসনে অভিজাতগণ ছিলেন অসন্তুষ্ট। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খান লোদী এবং সুলতানের চাচা আলম খান লোদী দিল্লির সিংহাসন দখলের জন্য বাবরের সাহায্য প্রার্থনা করেন।। সুযোগসন্ধানী সম্রাট বাবর সাথে সাথে এ আহ্বানে সাড়া দেন। তিনি বিনাবাধায় লাহোর জয় করেন। স্বয়ং সম্রাট বাবরকেই রাজ্য জয়ে সচেষ্ট দেখে দৌলত খান ও আলম খান তার বিরোধিতা শুরু করেন। অগত্যা সে বছর বাবরকে কাবুলে ফিরে যেতে হয়। সেটা ছিল ১৫:২৫ সাল।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ

পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৫২৬ সালে সম্রাট বাবর ১২(বার) হাজার সৈন্যকে কামান-বন্দ্দুকে সজ্জিত করে ভারত আক্রমণ করেন। ইবরাহিম লোদী তাকে বাধা দেয়ার জন্য এগিয়ে যান। ইবরাহিম লোদীর ছিল প্রায় এক লাখ সৈন্য, কিন্তু ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত পানিপথের যুদ্ধে সম্রাট বাবরের উন্নত রণকৌশল ও যুদ্ধাস্ত্রের কাছে ইবরাহিম লোদীর বিশাল সৈন্যবাহিনী পরাজিত হয়। ইবরাহিম লোদী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারান। সম্রাট বাবর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।

খানুয়া ও গোগরার যুদ্ধ

সাম্রাজ্য বিস্তার করার জন্য সম্রাট বাবরকে আরো বহু যুদ্ধ করতে হয়। ১৫২৭ সালে তিনি রাজপুত বীর রাণা সংগ্রাম সিংহের মুখোমুখি হন। খানুয়ার প্রান্তরে রাজপুতদের সাথে বাবরের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়।

শেষ পর্যন্ত সম্রাট বাবর জয়লাভ করেন। ১৫২৯ সালে সম্রাট বাবরকে আফগানদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে পরাজিত হলেও আফগান শক্তি সমূলে বিনষ্ট হয়নি। তারা ইবরাহিম লোদীর ভাই মাহমুদ লোদীর নেতৃত্বে আবার ঐকবদ্ধ হয়, কিন্তু সম্রাট বাবর অগ্রসর হয়ে গোগরার যুদ্ধে তাদের পরাজিত করেন।

সম্রাট বাবরের কৃতিত্ব

এভাবে পানিপথ, খানুয়া ও গোগরার যুদ্ধসমূহে জয় লাভের ফলে বাবরের নেতৃত্বে ভারতে মোঘল শাসনের সূচনা হয়। সম্রাট বাবর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু এ সাম্রাজ্য সুখ তিনি বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি। কথিত আছে, সম্রাট বাবর তাঁর পুত্র অসুস্থ হুমায়ুনের আরোগ্যের বিনিময়ে নিজ প্রাণ উৎসর্গ করে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলে সম্রাট হুমায়ুন আরোগ্য লাভ করেন। পরে সম্রাট বাবর অসুস্থ হয়ে ১৫৩০ সালে মৃত্যুমুখে পতিত হন। সম্রাট বাবরের মৃতদেহ তাঁর ইচ্ছানুযায়ী কাবুলে সমাহিত করা হয়।

বাবর পণ্ডিত ও কবি ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী ভুজকে বাবর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনীরূপে গণ্য । এ আত্মজীবনী ভারতে মোঘল ইতিহাসের খুব নির্ভরযোগ্য দলিল। সম্রাট বাবর সন্তানবৎসল ও বন্ধুবৎসল ছিলেন। তিনি তাঁর প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন। শাসনের ব্যাপারে তিনি ধর্ম বর্ণের ভেদাভেদ করতেন না।

নাসিরুদ্দীন মুহাম্মদ হুমায়ুন (১৫৩৩-১৫৪০)

বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসিরুদ্দীন মুহাম্মদ হুমায়ুন দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। সাম্রাজ্য সংহত করার আগেই সম্রাট বাবরের মৃত্যু হওয়ায় সিংহাসনে বসে হুমায়ুন নানা বিপদের সম্মুখীন হন। তাছাড়া যোগ্যতার দিক দিয়ে সম্রাট হুমায়ুন সম্রাট বাবরের সমকক্ষ ছিলেন না। পিতার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী ভাইদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দিয়ে হুমায়ুন নিজের বিপদ আরো বাড়িয়ে তোলেন। তিনি কামরানকে কাবুল ও কান্দাহার, হিন্দোলকে মেওয়াত এবং আসকারীকে সম্বলপুরের শাসক নিযুক্ত করেন। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে কামরান পাঞ্জাব দখল করে নেয়। অধ্য প্রয়োজনের সময় ভাইয়েরা সম্রাট হুমায়ুনকে তেমন কোনো সাহায্যই করেননি। এ জন্য মোঘলদের চরম ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল।

সংঘর্ষ

দিল্লীর সিংহাসনে বসেই সম্রাট হুমায়ুন পূর্বাঞ্চলের আফগানদের দমন করার জন্য অগ্রসর হন। এ সময় আফগান নেতা শের খান শূরী সম্রাট হুমায়ুনের কাছে মৌখিক আনুগত্য জানান। এরপর সম্রাট হুমায়ুন গুজরাটের বাহাদুর শাহের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। সে সুযোগে শের খান সূরী পুনরায় শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। তাঁকে দমন করার জন্য সম্রাট হুমায়ুন বিহারের দিকে অগ্রসর হন। তিনি শের খান শূরীর চুনার দুর্গ দখল করেন। এরপর তিনি বাংলার দিকে এগিয়ে যান। এক রকম বিনা বাধায় তিনি বাংলা দখল করেন। সম্রাট হুমায়ুন বাংলার রাজধানী গৌড়ের নাম রাখেন জান্নাতাবাদ। বর্ষা এসে পড়ায় প্রায় ৯ মাস হুমায়ুনকে গৌড়ে অবস্থান করতে হয়। এ সুযোগে শের খানশূরী জৌনপুর, বারানসী প্রভৃতি জয় করে কন্নৌজ পর্যন্ত অগ্রসর হন। এতে সম্রাট হুমায়ূনের দিল্লি ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বর্ষা শেষে সম্রাট হুমায়ুন দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বক্সারের কাছে চৌসা নামক স্থানে সম্রাট হুমায়ুন শের শাহ শূরী কর্তৃক অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হন। চৌসার যুদ্ধে (১৫৩৯ সাল) পরাজিত হয়ে সম্রাট হুমায়ুন কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে দিল্লি পৌঁছেন। বিজয়ী শের খান ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। পরের বছর (১৫৪০ সাল) শের শাহের বিরুদ্ধে হুমায়ুন আবার অভিযান পরিচালনা করেন, কিন্তু কনৌজের নিকট বিলগ্রামের যুদ্ধে তিনি এবারও পরাজিত হন। বিজয়ী শের শাহ শূরী দিল্লি ও আগ্রা দখল করে নিজেকে দিল্লির সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। রাজ্যহারা সম্রাট হুমায়ুন কিছুদিন এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে পারস্যে চলে যান। ফলে ভারতে সাময়িকভাবে মোঘল শাসনের অবসান ঘটে। এ সুজোগে শের শাহ সূরী ভারতে পাঠান শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

পরের পর্বে আরো  দেখুন…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!