শহীদ তিতুমীর (রহ.) (১৭৮২-১৮৩১)

আযাদী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক শহীদ তিতুমীর (রহ.)-এর নাম ইতিহাসের পাতায় চিরদিনই স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত থাকবে। তিনিই সর্বপ্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে বীর শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। মুসলমানদের প্রতি দেশীয় জমিদার ও নীলদের অত্যাচার, শোষণ ও অবিচারের প্রতিকার করার জন্য তিনি সংগ্রামী চেতনায় অনুপ্রাণিত হন। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বাংলার অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শহীদ তিতুমীর (রহ.) ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। এ বীর সৈনিক ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাজী নিয়ামতুল্লাহর কাছ থেকে কুরআন, হাদীস, আরবী ও ফারসি ভাষা এবং সাহিত্য শিক্ষা লাভ করেন। তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন মল্লযোদ্ধা।
 
মক্কা শরীফে হজ করতে গেলে হযরত শহীদ তিতুমীর (রহ.) মুক্তি সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে এসে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। শহীদ তিতুমীর ইসলামের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। তিনি মানবতার মুক্তির জন্য মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে উৎসাহিত করেন। প্রথমে শহীদ তিতুমীর (রহ.) চব্বিশ পরগণার নারিকেলবাড়িয়ায় সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করেন। চব্বিশ পরগণা ও নদীয়ার অনেক কৃষক তাঁর আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। অতি অল্পদিনের মধ্যে শহীদ তিতুমীর (রহ.) এ আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নেয় এবং দলে দলে লোক তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামী আদলে জীবনযাপন করতে শুরু করে। শহীদ তিতুমীরের জনপ্রিয়তা দেখে পূর্ণিয়ার জমিদার কৃষ্ণদেব মুসলমান কৃষকদের দাড়ির উপর জনপ্রতি আড়াই টাকা হারে কর আরোপ করে। বেআইনি কর সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে জমিদার শহীদ তিতুমীরের সমর্থকদের বাড়িঘর লুট করে এবং মসজিদ পুড়িয়ে দেয়। শহীদ তিতুমীর (রহ.) থানায় অভিযোগ করলে তা অগ্রাহ্য করা হয়।
 
শহীদ তিতুমীর (রহ.) শান্তিপূর্ণভাবে এবং সমঝোতার মাধ্যমে প্রজাদের অত্যাচারের প্রতিকার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে প্রজাদের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি অস্ত্রধারণ করেন। তিনি বারাসাতে ইংজেরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কোম্পানির বিরুদ্ধে এটাই তাঁর প্রথম বিদ্রোহ। তিনি চব্বিশ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। তাঁকে দমন করার জন্য বারাসতে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রেরিত সশস্ত্র বাহিনী শহীদ তিতুমীরের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এ বিদ্রোহ বারাসাতের বিদ্রোহ নামে পরিচিত। উইলিয়াম হান্টারের মতে, এ বিদ্রোহে ৮৩ হাজার কৃষকসেনা শহীদ তিতুমীরের পক্ষে যোগদান করে।
 
বারাসাতের যুদ্ধের পর শহীদ তিতুমীর ইংরেজদের পক্ষ থেকে সরাসরি আক্রমণের আশঙ্কাবোধ করেন। তাই যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সেনা প্রশিক্ষণ এবং নিজ বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য নারিকেলবাড়িয়ায় ১৮৩১ সালে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ এবং সেখানে যুদ্ধাস্ত্র জমা করেন। শহীদ তিতুমীর তাঁর সহচর গোলাম মাসুমকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি নীলকরদের কুঠি আক্রমণ করলে ভীত সন্ত্রস্ত নীলকররা সপরিবারে কলকাতায় পালিয়ে যায়।
 
অতঃপর কোম্পানি সরকার ১৮৩১ সালে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী ও বন্দুকধারী সৈন্যদের এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করে। ১৯ নভেম্বর নারিকেলবাড়িয়ায় এক ভীষণ যুদ্ধ হয়। ইংরেজদের কামান ও গোলা বর্ষণে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। অনেকেই বন্দি হন। বিচারের নামে প্রহসনে যুদ্ধ বন্দিদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়। সেনাপতি গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেয়া হয়। শহীদ তিতুমীর (রহ.) সত্যিকার অর্থেই দেশপ্রেমিক ছিলেন। তিনি নির্ভীক বীরের মতো দেশ ও জাতির মুক্তি আন্দোলনে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তিনি ভবিষ্যত স্বাধীনতাকামী সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক হয়ে অমর হয়ে আছেন। শহীদ তিতুমীরের জমিদারবিরোধী আন্দোলন, নীলকর এবং ইংরেজবিরোধী সংগ্রাম পরবর্তীকালের সকল আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। শহীদ তিতুমীরের সেই বাঁশের কেল্লা আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
 

ফরায়েজী আন্দোলন

ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে যেসব ধর্মীয় আন্দোলন হয়েছিল; ফরায়েজী আন্দোলন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি এটি ছিল কৃষক আন্দোলন।
 
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে মুসলমান সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চরম দুর্দশা নেমে আসে। কোম্পানি মুসলমানদের সেনা বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য চাকরি থেকে বিতাড়িত করার ফলে অজস্র মুসলিম পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্ধারিত খাজনা আদায় ছাড়াও ব্রিটিশ পদলেহী জমিদার, নায়েব, গোমস্তা, সরকারি কর্মচারীরা নানা ধরনের অত্যাচারের মাধ্যমে কৃষক সমাজকে পঙ্গু করে দেয়।
 
ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে জমিদারদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল হিন্দু। আর প্রজারা অধিকাংশই ছিল গরিব কৃষক। জমিদারগণ প্রজাদের উপর অবৈধভাবে নানা প্রকার কর ধার্য ও আদায় করত। ইংরেজরা কোটি কোটি টাকা মূল্যের লা-খেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করায় যেমন সম্ভ্রান্ত অনেক পরিবার ধ্বংস হয়, তেমনি অনেক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ধ্বংস হয়ে যায়। তখনকার সময়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো লা-খেরাজ সম্পত্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শুধু বাংলায় এ ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মাদরাসা ছিল আশি হাজার। মাদরাসাগুলো ধ্বংস হওয়ার ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে এবং কুপ্রথা, অন্ধ বিশ্বাস ও অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়।
 
তাছাড়া নীলকরদের বস্ত্রশিল্পের বিকাশের ফলে ব্রিটেনে নীলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সেখানে নীল উৎপাদনের কাঁচামাল পাওয়া যেত না। তাই এদেশী কৃষকদের ওপর বল প্রয়োগ করে নীল চাষ করানো হতো এবং নামমাত্র মূল্যে তা ক্রয় করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হত। অমানুষিক অত্যাচারে নীলচাষীদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। নীলকররা চাষীদের জোরপূর্বক নীলের চাষ করতে বাধ্য করত। ইংরেজ বিচারকদের পক্ষপাতিত্বের জন্য চাষীরা সুবিচার পেত না। মুসলমান সমাজের এ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন দেখে যিনি এর প্রতিকার ও সংস্কারের জন্য এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)। তিনি সে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, সে আন্দোলন “ফরায়েজী আন্দোলন” নামে পরিচিত। ইসলামের ‘ফরজসমূহ’ পালনের জন্য হাজী শরীয়তুল্লাহ জোর প্রচার চালান। এই ‘ফরজ’ থেকেই এ আন্দোলনের নাম ফরায়েজী হয়েছে।
 

হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) (১৭৮১-১৮৪০)

 
মহান সংস্কারক হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ১৭৮১ সালে বর্তমান শরীয়তপুর জেলার
 
শামাইল নামক গ্রামে এক মধ্যবিত্ত তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বার বছর বয়সে
 
তিনি কলকাতায় গমন করে মাওলানা বাশারত আলীর কাছে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন।
 
অতঃপর তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় শিক্ষালাভ করেন। ১৭৯৯ সালে তিনি পবিত্র হজ সম্পন্ন করতে মক্কা শরীফ গমন করেন। তথায় তিনি হানাফী মাযহাব এবং কাদেরিয়া তরিকার
সৃফি মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি দু’বছর কায়রোর জামিয়া আল-আজহার শিক্ষাকেন্দ্রে অবস্থান করেন। ১৮১৮ সালে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
 
ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) ছিলেন একজন ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি মুসলমান সমাজকে অনৈসলামিক কার্যকলাপ থেকে সরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। সে জন্য ধর্মের মৌলিক বিধান বা ফরজগুলো যথাযথ পালনে উদ্বুদ্ধ করা, নৈতিক দিক দিয়ে বলীয়ান করা, ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা, কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, কৃষক প্রজাদের সরকার, জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার এবং উৎপীড়ন থেকে মুক্ত করে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করাই ছিল তাঁর আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য।
 
ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর জেলা। এছাড়া ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা প্রভৃতি জেলায় এ আন্দোলন জনপ্রিয়তা লাভ করে।
 
হাজী শরীয়তুল্লাহর (রহ.)-এর জনপ্রিয়তা দেখে স্থানীয় হিন্দু জমিদারগণ ফরায়েজী আন্দোলনের বিরোধিতা শুরু করে। তারা প্রজাদের উপর নানা ধরনের অবৈধ কর আরোপ করত। দুর্গাপূজা, কালীপূজা প্রভৃতি হিন্দু উৎসবের জন্য মুসলমানদের কাছ থেকে কর আদায় করা হতো। ঈদ উপলক্ষে কোনো কোনো হিন্দু জমিদার গরু কুরবানী করতে নিষেধ করত। এভাবে নানা রকম অজুহাতে হিন্দু জমিদারগণ ফরায়েজীদের অত্যাচার করতে থাক। হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) তাদের রক্ষার জন্য একটি লাঠিয়াল বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় তাঁর শিষ্য জালালুদ্দীন মোল্লার উপর। জমিদাররা বিভিন্ন উপায়ে তাঁকে হয়রানি করতে চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের উৎপীড়ন ও বিরোধিতা কিছুতেই ফরায়েজীদের অগ্রগতি রোধ করতে পারেনি।
 
হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) তাঁর অনুসারীদের নীলকরদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও শোষণ থেকে মুক্ত করতেও সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তিনি বাংলার কৃষকদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। তাঁরই নেতৃত্বে কৃষকেরা জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮৪০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুহসিনুদ্দীন ওরফে দুদু মিয়া (রহ.) এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
 
পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!