মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশ

আরবদের সিন্ধু বিজয়

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের বিজয় তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমn পর্যায় ছিল আরবদের সিন্ধু বিজয়। তখন উমাইয়া বংশের ওয়ালীদ মুসলিম জাহানের অলীফা ছিলেন। তিনি ৭০৫ থেকে ৭১৫ সাল পর্যন্ত খিলাফত পরিচালনা করেন। এ সময় ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু ও মুলতানের রাজা ছিলেন দাহির। আরব সাম্রাজ্য তখন রাজা দাহিরের রাজ্যসীমার প্রায় কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। নানা কারণে মুসলমানগণ রাজা দাহিরের রাজ্য আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়।

সিন্ধু অভিযানের কারণ

সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য ছিল। মুসলিম সাম্রাজ্যের পূর্ব অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুক। তাঁর আমলে আরব সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল থেকে কিছু সংখ্যক বিদ্রোহী পালিয়ে এসে দাহিরের রাজ্যে আশ্রয় নেয় এবং তারা রাজা দাহিরের আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। এতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ক্ষুব্ধ হয়।

দ্বিতীয় কারণ হলো, খলীফা ওয়ালীদ এবং ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজের নিকট সিংহলের (শ্রীলঙ্কার) রাজা সিন্ধি জলদস্যু কর্তৃক আটটি আরব জাহাজ লুণ্ঠন এবং কয়েকজন আরব বণিক হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আটটি জাহাজ বোঝাই উপঢৌকন পাঠায়। কিন্তু সিন্ধুর দেবল (বর্তমান করাচি) বন্দরে তা জলদস্যুদের দ্বারা লুষ্ঠিত হয়। এ জন্য হাজ্জাজ রাজা দাহিরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। কিন্তু দাহির জলদস্যুদের অপরাধের দায়িত্ব নিতে ও ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, এসব কারণে হাজ্জাজ দাহিরের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠায়। কিন্তু পরপর দু’টি অভিযান। ব্যর্থ হয়।

তারপর ৭১২ সালে হাজ্জাজ তৃতীয় অভিযান প্রেরণ করেন। এ অভিযানের নেতৃত্ব দেন হাজ্জাজের ভ্রাতৃষ্পুত্র ও জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিম। দাহির যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ হারান। তার পত্নী রানীবাঈ ও পুত্র জয়সিংহ রাওয়ার দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের হাতে রাওয়ার দুর্গের পতন হলে রানী ও অন্তঃপুরের মহিলাগণ আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেয়। তারপর মুহাম্মদ বিন কাসিম আলোর ও মুলতান দুর্গ জয় করেন। এভাবে দাহিরের সমগ্র রাজ্য মুসলমানদের দখলে চলে আসে। মুহাম্মদ বিন কাসিম বিজিত অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন।

সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল

সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। যদিও দীর্ঘ দিন মুসলিম বিজয় শুধু সিন্ধুতেই সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও এ বিজয় পরবর্তীকালে মুসলমানদের ভারত বিজয়ের উৎসাহ ও প্রেরণা জোগায়। এ বিজয়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ফলাফল ছিল আরও ব্যাপক। সিন্ধু বিজয়ের ফলে হিন্দু ও বৌদ্ধগণ মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে। মুসলমানদের চরিত্র ও আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে। পরবর্তীকালে স্থানীয় বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আরব মুসলমানদের অনেকেই স্থানীয় মহিলাদের বিয়ে করে এখানে বসবাস করতে থাকে। মুসলমানগণ ভারতীয় গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি শাস্ত্রের চর্চা করে এবং সেসব শাস্ত্রের উন্নতি ঘটায়। এভাবে মুসলমানগণ তাদের সভ্যতা সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে বিরাট এক বিপ্লব ঘটায়।

সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযান

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রায় তিনশ’ বছর পর ভারতীয় উপমহাদেশ অভিমুখে দ্বিতীয় পর্যায়ে মুসলিম অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানের নেতা ছিলেন গজনীর সুলতান মাহমুদ। পিতা সবুক্তগীনের মৃত্যুর পর ৯৯৭ সালে তিনি গজনীর সুলতান হন। তিনি ছিলেন সুশাসক এবং সাহসী যোদ্ধা।

ভারত অভিযানের কারণ 

সবুজগীনের শাসনামল থেকেই পাঞ্জাবের রাজ বংশীয় রাজপুত রাজা জয়পালের সাথে গজনীর বিরোধ চলে আসছিল। সুতরাং পাঞ্জাবের সাথে শত্রুতা সুলতান মাহমুদ উত্তরাধিকার সূত্রেই লাভ করেছিলেন। তাছাড়া ভারতে এ সময় কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল না। সারা ভারতবর্ষ ছিল ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত। এসব রাজ্যের মধ্যে ঐক্য ও সদ্ভাব ছিল না।

সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারতবর্ষে অভিযান চালিয়েছিলেন। তিনি হিন্দু রাজা জয়। পালের আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপেই এ সব অভিযান পরিচালনা করেন। ২০০০ থেকেn ১০২৭ সালের মধ্যে সুলতান মাহমুদ মোট ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন। ১০০১ সালের যুদ্ধে জয়পাল পরাজিত ও বন্দী হয়। পরে তাকে শর্ত সাপেক্ষ্যে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু বারবার পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে সে চিতার আগুনে আত্মাহুতি দেয়।

১০০৮ সালে সুলতান মাহমুদ জয়পালের পুত্র আনন্দপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এ যুদ্ধে আনন্দপাল উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর কাছে থেকে প্রচুর অর্থ ও সৈন্য সাহায্য পেয়েছিল। বর্তমান পেশোয়ার শহরের কাছে আনন্দপালের মিলিত বাহিনীর সাথে সুলতান মাহমুদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের প্রথম দিকে আনন্দপালের জয় হলেও শেষ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদের দক্ষতার কাছে তাকে নতিস্বীকার করতে হয়। এ যুদ্ধের ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাবের উপর সুলতান মাহমুদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়।

১০০৯-১০১৪ সালের মধ্যে সুলতান মাহমুদ নগরকোট, মুলতান, আলোয়ার, কাশ্মীর ও থানেশ্বর জয় করেন। ১০১৮ সালে তিনি ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ হিন্দু রাজ্য কনৌজ আক্রমণ করেন। কল্লৌজের রাজা রাজ্যপাল সুলতান মাহমুদের অজেয় সৈন্যবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন। ১০২১ সালে সুলতান মাহমুদ চঙেলার রাজা গণ্ডকে কালিঞ্জের যুদ্ধে পরাজিত করেন। ১০২৬ সালে কাথিয়াওয়াড়ের সোমনাথ মন্দিরের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় মাহমুদের ষোড়শ অভিযান। ভারতের হিন্দু রাজারা মিলিতভাবে সোমনাথ মন্দির রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। সোমনাথ অভিযান থেকে সুলতান মাহমুদ আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন। সুলতান মাহমুদের শেষ অভিযান পরিচালিত হয় ১০২৭ সালে জাঠদের বিরুদ্ধে। ১০৩০ সালে সুলতান মাহমুদের মৃত্যু হয়।

অভিযানের ফলাফল

সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানগুলো ছিল সামরিক কারণজনিত। এখানে কোনো স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর এতগুলো অভিযানের স্থায়ী ফল হিসেবে শুধু উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও পান্তানই গজনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে পরবর্তী ভারত অভিযানের পথ সুগম হয়। ফলে পরবর্তী মুসলিম বিজয় সহজ হয়েছিল। এ অভিযানের ফলে ভারতে মুসলমানের সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পায়। সুলতান মাহমুদের সাথে অনেক আলেম-উলামা এবং পণ্ডিত ব্যক্তিরাও ভারতে এসেছিলেন। তারা ভারতের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সকল পণ্ডিতের মধ্যে কিতাবুল হিন্দ রচয়িতা আলবিরুনী ছিলেন অন্যতম। সুলতান মাহমুদ শাহনামা রচয়িতা কবি ফেরদৌসীর গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারক ও প্রজাহিতৈষী শাসক।

মুহাম্মদ ঘুরীর ভারত অভিযান

আফগানিস্তানের গজনী ও হেরাতের মধ্যস্থলে অবস্থিত ঘুর রাজ্য। ঘুরের রাজা গজনী জয় করে তাঁর ভাই শিহাবুদ্দীনকে গজনীর শাসক নিযুক্ত করেন। ইতিহাসে তিনি মুহাম্মদ ঘুরী বা শিহাবুদ্দীন মুইযুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী নামে বিখ্যাত।

সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর প্রায় দেড়শ বছর পর তিনি ভারত অভিমুখে তৃতীয় পর্যায়ে মুসলিম অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর অভিযানের ফলেই ভারতে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ১১৯১ সালে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে তিনি রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তিনি পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে দিল্লি ও আজমীর দখল করেন।

শাসন প্রতিষ্ঠা

গজনী ফিরে যাওয়ার আগে মুহাম্মদ ঘুরী তাঁর ক্রীতদাস ও বিশ্বস্ত। সেনাপতি কুতুবুদ্দীন আইবেককে ভারতের অধিকৃত অঞ্চলগুলোর শাসনভার দিয়ে যান। কুতুবুদ্দীন দিল্লিতে শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেন। এভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে স্থায়ী মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

রাজ্য জয়: ১১৯৪ সালে মুহাম্মদ ঘুরী আবার ভারতে আসেন। এবার তিনি কন্ট্রোজের রাজা জয়চাদকে আক্রমণ করেন। জয়চাঁদ পরাজিত হয়। কনৌজ ও বারানসী মুসলমানদের শাসনাধীনে আসে। মুহাম্মদ ঘুরী ১২০৩ সালে ঘুরের সিংহাসনে বসেন। তখন তিনি মুইজুদ্দীন উপাধি ধারণ করেন। কুতুবুদ্দীন তার অধীনে দিল্লির শাসনকর্তা হিসেবে বহাল থাকেন। এ সময়ে আর এক মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী (১২০৪-০৫ সাল) সমগ্র বিহার ও বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল জয় করেন। এভাবে বাংলা পর্যন্ত মুসলিয় অধিকার বিস্তৃত হয়। ১২০৬ সালে মুহাম্মদ ঘুরী পাঞ্জাবের একটি বিদ্রোহ দমন করতে আসেন, কিন্তু রাজধানীতে ফিরে যাওয়ার পথে আততায়ীর হাতে নিহত হন। মুহাম্মদ ঘুরী ছিলেন ভারতে মুসলিম রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!