ইসলামী সংস্কার আন্দোলন মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) (১৫৬৪-১৬২৪)

মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) (১৫৬৪-১৬২৪)

ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন নানা অনাচারে পূর্ণ ছিল। ইসলামী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে মুসলিম শাসকেরা ভোগবিলাসে মত্ত হয়। তাদের জীবন নানা পাপাচার ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মূলত মুসলমানদের এ অধঃপতন ও বিভ্রান্তির কারণ ছিল আকবরের ধর্মীয় নীতি। এমনি এক সংকটময় মুহূর্তে ক্ষণজন্মা মহামনীষী শায়খ আহমদ সেরহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.)-এর জন্ম হয়।

১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাঞ্জাবের সেরহিন্দ শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই তিনি কুরআন, হাদীসসহ ইসলামী শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি অধ্যাপনায় নিয়োজিত হন। পরে উচ্চতর জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি জৌনপুর ও আকবরাবাদ (আগ্রা) সফর করেন। আগ্রায় অবস্থানকালে তিনি আকবরের সভাসদ ফৈজী ও আবুল ফ্যলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পান। ফলে তিনি সম্রাট ও আমির ওমারাদের অনেক অনৈসলামিক কার্যকলাপ লক্ষ করেন। তিনি সম্রাট আকবরের দীনে ইলাহীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। সম্রাটের দরবারে সম্মানসূচক সেজদা প্রথার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেন। তাছাড়া তিনি সকল ধরনের বিদআত ও শিরক-এর বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলেন।

সম্রাট আকবরের পর সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারেও অনৈসলামিক কার্যকলাপ অব্যাহত থাকে। শায়খ আহমদ (রহ.)-এর বিরোধিতার কথা শুনে সম্রাট তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান। সেখানেও তিনি স্বীয় অবস্থানে অটল থেকে ইসলামি কায়দায় সালাম দিয়ে মাথা উঁচু করেই দরবারে প্রবেশ করেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, মু’মিনের মাথা আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হবে না, কিন্তু সম্রাট এতে অপমানিত বোধ করে তাঁকে বন্দী করে গোয়ালিয়র দুর্গে পাঠান।

বন্দী জীবন তাঁর জন্য শাপে বর হয়। সেখানে তাঁর হাতে বেশ কিছু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। তাছাড়া উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাসহ বহু সৈনিক তাঁর কাছে বায়আত গ্রহণ করেন। এদিকে সম্রাট সম্ভবত নিজেই আপন আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেন এবং দরবারের সেজদা প্রথা, মদ্যপান ও অন্যান্য অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিহার করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এভাবে শায়খ আহমদ (রহ.)-এর প্রচেষ্টায় ইসলামবিরোধী এবং শিরক ও বিদআতমূলক বহু কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক জীবনধারার ওপর জোর দেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় বহু মকতব, মাদরাসা ও মসজিদ নির্মিত হয়। তাঁর হাতে হাজার হাজার লোক বায়আত হয়। তাঁর সুদূরপ্রসারী সংস্কারমূলক কাজের জন্য তাঁকে মুজাদ্দিদে আলফে সানী বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

তাঁর রচনাবলির মধ্যে তিন খণ্ডে সমাপ্ত মকতুবাতে আলফে সানী গভীর তত্ত্বজ্ঞান ও সঠিক ইসলামি ব্যাখ্যার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। গ্রন্থটি হযরত জালালুদ্দীন রুমী (রহ.)-এর মাসনবী শরীফ-এর সঙ্গে তুলনীয়। এ মহান সংস্কারক ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে সেরহিন্দে ইনতেকাল করেন।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) (১৭০৩-১৭৬২)

মুগল শাসনের পতন যুগে ১৭০৩ সালে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.)-এর জন্ম হয়। তাঁর পিতা শাহ আবদুর রহীম দেহলবী একজন বিখ্যাত আলিম ছিলেন। পনের বছর বয়সে তিনি ইসলামী শিক্ষায় অগাধ জ্ঞান লাভ করেন এবং ১৭১৯ সালে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় অধ্যাপনা শুরু করেন। ১২ বছর অধ্যাপনার পর তিনি হিজাযে গমন করেন। মদিনার শায়খ আবু তাহির মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম কুরদী (রহ.) প্রমুখের নিকট থেকে হাদীস বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। তিন বছর পর দেশে ফিরে তিনি ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

তখন মুগল শাসকদের অযোগ্য উত্তরসূরীরা আত্মকলহে লিপ্ত। দেশে নানা বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। মারাঠা ও শিখদের হাতে মুসলমানরা তখন নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছিলেন। তা ছাড়া বিদেশী বণিক ইংরেজ শক্তিও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠছিল। এ দুর্দিনে ধ্বংসের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.) উপায় অনুসন্ধান করতে থাকেন। তিনি উপলব্ধি করেন, মুসলমানদের পতনের কারণ হলো ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। তাই ইসলামের অনুশাসনে ফিরে আসাই তাদের রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়।

এ লক্ষ্যে তিনি ইসলামী সমাজ, দর্শন ও রাজনীতি বিষয়ে প্রায় ২০০ গ্রন্থ রচনা করেন।। তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’, ‘ইযালাতুল খাফা’, ফাওযুল কবীর’ প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্ববিখ্যাত তিনি । কুরআন ও হাদীসভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সর্বপ্রথম কুরআন মাজিদ ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী ছিলেন উদারপন্থী। সংকীর্ণ দলাদলি পরিহার করে। সত্য পথের দিকে তিনি সকলকে আহ্বান করেন। তিনি একজন যুগশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ছিলেন। তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর চার জন সুযোগ্য পুত্র ছিলেন। তারা হলেন- শাহ আবদুল আধীয়, শাহ আবদুল কাদির দেহলবী, শাহ রফীউদ্দীন দেহলবী ও শাহ আবদুল গনী মুজাদ্দেদী (রহ.)। তাঁদের মাধ্যমে এ সংস্কার আন্দোলন ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ১৭৬২ সালে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.) ইনতেকাল করেন।

শাহ আবদুল আযীয (রহ.) (১৭৪৬-১৮২৩)

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.)-এর সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী ছিলেন ভারতীয় মুসলিম জাগরণ ও সংস্কার আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। পিতার আদর্শকে সামনে রেখে তিনি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। মুসলিম সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও অনৈসলামিক আচার-আচরণ রহিত করা ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। কুরআন সুন্নাহর আদর্শ ও ভাবধারায় মুসলমানদের উজ্জীবিত করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তাঁর সময়কালে অত্যাচারী শিখ ও শোষক বণিক ইংরেজদের অত্যাচারে মুসলমানদের জীবন ছিল অতিষ্ঠ। তাদের বিতাড়নের জন্য তিনি জিহাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এতে ভারতীয় মুসলানদের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। ১৮০৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চালু হলে তিনি ভারতবর্ষকে ‘দারুল হরব’ বা শত্রু কবলিত দেশ ঘোষণা করেন। তাঁর এ ঘোষণা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করে।

তাঁর রচনাবলির মধ্যে ‘তাফসীরুল ফাতহিল আযীয়’, ‘তুহফায়ে ইছনা আশারিয়া’ ও ‘বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলার জাগরণ

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ শাসনের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ছিল প্রকৃতপক্ষে প্রবঞ্চনা, অত্যাচার, অবিচার, শোষণ ও দমননীতির শাসন। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত একশ বছরের ইতিহাস ছিল সংগ্রামের ইতিহাস। এ সুদীর্ঘ সময়ে বাংলার সর্বত্র বিদেশী শাসন শোষণের বিরুদ্ধে জনগণ কখনও বিচ্ছিন্নভাবে, আবার কখনও সংগঠিতভাবে লড়াই করেছেন, বিদ্রোহ করেছেন। কখনও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন, আবার কখনও কিছুটা সাফল্য। পেয়েছেন। এর মধ্যে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ফকির বিদ্রোহ, শহীদ তিতুমীর (রহ.)-এর বাঁশের কেল্লাভিত্তিক আন্দোলন ও হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.)-এর ফরায়েজী আন্দোলন ছিল। অন্যতম।

ফকির বিদ্রোহ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ক্ষমতা লাভের পর সর্বপ্রথম যে সংঘবদ্ধ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তা ইতিহাসে ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ফকিররা ১৭৬০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেছিলেন। ফকিরদের সাথে সন্ন্যাসীরাও সংঘবন্ধ হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। ফকির-সন্ন্যাসীদের পার্থিব বা বৈষয়িক কোনো লোভ-লালসা ছিল না। তাঁরা আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁরা ভ্রাম্যমাণ সংঘে বিভক্ত ছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে সারা বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁরা বর্শা, তরবারি ও বন্দুক বহন এবং কোনো কাজে বাধাগ্রস্ত হলে এসব অস্ত্র ব্যবহার করতেন।

কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিশেষ এক প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির কারণে ফকির-সন্ন্যাসীরা সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিম ফকির সন্ন্যাসীদের সাহায্য কামনা করেছিলেন। তারা তার পক্ষে যুদ্ধও করেন। মীর কাসিম পরাজিত হলেও ফকিররা ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যান। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকবর্গ ফকির-সন্ন্যাসীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় বাধা প্রদান করে এবং তাঁদের দস্যু বলে। চিহ্নিত করে। এসব কারণে কোম্পানির সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তাঁরা এক দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। দরিদ্র কৃষক ও বেকার মানুষের এক বিরাট বাহিনী তাদের সঙ্গে যোগদান করে। ফকির-সন্ন্যাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল কোম্পানির কুঠি, জমিদারদের কাছারি, নায়েব-গোমস্তাদের বাড়ি আক্রমণ করা। এছাড়া কোম্পানির বেনিয়াদের নৌকা আক্রমণ, সৈন্যদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং যোগাযোগ বিপর্যস্ত করা ইত্যাদি। ফকির-সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক।

১৭৮৭ সালে ফকির মজনু শাহের মৃত্যুর পর সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ফকির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে দলীয় কোন্দল শুরু হয়। সাংগঠনিক দুর্বলতা, যোগাযোগের অভাব, ধর্মীয় ভেদাভেদ ফকির আন্দোলনের পতন ত্বরান্বিত করে। এছাড়া কোম্পানির তৎকালীন উন্নততর রণকৌশল এবং আধুনিক সেনাবাহিনীর আয়তন বৃদ্ধির ফলে ফকির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়।

বস্তুত ফকির-সন্ন্যাসীরা দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ এবং পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। 

পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!