ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫)

ঊনিশ শতকে বাংলা তথা সমগ্র ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার সুবাদে একটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে ওঠে। এ শ্রেণি ইংরেজ সরকারের অনুগত হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়, ভারতীয়দের অভাব অভিযোগ, দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পেশ করার জন্য একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনে অংশ গ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন, স্বায়ত্তশাসন অর্জন ইত্যাদি বিষয়ে তারা উদগ্রীব হয়ে ওঠেন।

এ পরিস্থিতিতে অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম নামক একজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতদরদী সিভিলিয়ান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাইতে (বোম্বে) বাঙালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশনে সত্তরজন প্রতিনিধি যোগ দান করেন।

এ অধিবেশনে কংগ্রেসের জন্য কয়েকটি লক্ষ্য স্থির করা হয় :

১। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিকের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করা।

২। দেশের স্বার্থে নিবেদিত ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ ও মৈত্রী গঠন করা।

৩। সামাজিক সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ করা এবং

৪। রাজনীতিবিদদের নীতি ও লক্ষ্য স্থির করা।

আলোচনা করা এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের কাছে দাবি-দাওয়া পেশ করা। পরে এ প্রথম দিকে কংগ্রেসের সদস্যরা ছিলেন মধ্যপন্থী।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠান ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় কংগ্রেস এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুসলিম লীগ (১৯০৬)

ভারতীয় মহাদেশের মুসলমানদের ঐক্য রক্ষা করে, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে। ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের জন্য একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজের বিক্ষোভ ও আন্দোলন মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। এ সময় কংগ্রেস যে ভূমিকা পালন করে তাতে কংগ্রেস মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে- এ বিশ্বাস বিনষ্ট হয়ে যায়।

১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর ৩৫ জন মুসলিম নেতার সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল তৎকালীন বড় লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সিমলায় সাক্ষাৎ করেন। এটি সিমলা ডেপুটেশন নামে পরিচিত। এ সাক্ষাৎকারে মুসলমানদের জন্য কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে স্বতন্ত্র নির্বাচন এবং সামরিক, বেসামরিক সকল চাকরিতে ব্যাপক হারে মুসলমানদের নিয়োগ করার দাবি জানানো হয়, কিন্তু হিন্দু নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের দাবিগুলোর নিন্দা করে। এ বৈঠকের পর মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্ব ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে নবাব ভিকারুল মুলক-এর সভাপতিত্বে একটি রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণের পর নওয়াব সলিমুল্লাহ ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং ঐদিনই নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয়।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন

বঙ্গভঙ্গ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ ঘটনা হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ।

ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে দু’টি আলাদা প্রদেশ। করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর ও আসাম নিয়ে বাংলা প্রেসিডেন্সি গঠিত হয়েছিল। একজন গভর্নরের পক্ষে এত বড় প্রদেশ শাসন করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার ছিল। তাই লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে যুক্ত করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে এক নতুন প্রদেশ গঠন করেন। নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। নতুন প্রদেশের প্রথম ছোট লাট হলেন ব্যামফিল্ড ফুলার। অপরপক্ষে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে অন্য প্রদেশ গঠিত হয়। প্রশাসনিক সুবিধা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা বঙ্গভঙ্গের মূল এবং প্রাথমিক কারণ ছিল।

লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে প্রদেশটিকে দু’ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন প্রদেশ হলে দু’প্রদেশেরই শিক্ষা, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। সে জন্য ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়।

বঙ্গভঙ্গ রদ

কিন্তু বর্ণবাদী ও কায়েমী স্বার্থবাদী হিন্দুরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। জাতীয় কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। স্বদেশী আন্দোলন, উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং সন্ত্রাসবাদীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিশালী ব্রিটিশরাও হিন্দুদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে অবশেষে বঙ্গভঙ্গ রদ-এর পরিকল্পনা রচনা করে।

বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর শাসন পরিষদের অন্যতম সদস্য স্যার জন জেনকিনস নতুনভাবে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন। নতুন পরিকল্পনা অনুসারে প্রেসিডেন্সি, বর্ধমান, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম এ পাঁচটি বাংলা ভাষাভাষী বিভাগ নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করা হয়। নতুন বাংলা প্রদেশের রাজধানী হলো কলকাতা।

১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার ফলে ঢাকা শহর তার রাজধানীর গৌরব হারায়। বাংলা ভাষাভাষী পাঁচটি বিভাগ নিয়ে গঠিত হয় ‘নতুন বাংলা প্রদেশ’।

‘বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণায় সকল শ্রেণির হিন্দু খুব উল্লসিত হয়। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা হতাশ হয়ে পড়েন এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের প্রলুব্ধ করার জন্য বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ আশ্বাস দেন, ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রচনার জন্য তিনি একটি কমিটিও গঠন করেন। বাংলার অনেক হিন্দু এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। বঙ্গভঙ্গ রদ-এর ফলে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ দেখা দেয়, যা পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। খেলাফত আন্দোলন (১৯১৯)

বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের মনোভাব প্রবল। ভারতীয় মুসলমানগণ এর ব্যতিক্রম ছিল না। তারা তুরস্কের সুলতানকে খলীফা বলে মান্য করত এবং তাঁকে মুসলিম জাহানের ঐক্যের প্রতীক বলে মনে করত। খেলাফতের প্রতি কোনোরকম অবমাননা মুসলমানদের ব্যথিত করত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ নিয়ে মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করায় ভারতীয় মুসলমানরা দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়। এক দিকে তুরস্কের সুলতানের প্রতি ধর্মীয় 1* আনুগত্য প্রদর্শন করা। অপর দিকে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন অর্থ খিলাফত প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা।

ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের মনোভাব উপলব্ধি করে আশ্বাস দিয়েছিল, তারা যুদ্ধে জয়ী হলে তুরস্কের কোনো ক্ষতি করবে না। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতবাসীকে স্বায়ত্তশাসন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দেয়া হবে। এসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রিটিশ সরকার এদেশের মানুষেরও নৈতিক সমর্থন লাভে সক্ষম হয়েছিল ।

যুদ্ধে মিত্রপক্ষের জয় হয়, কিন্তু বৃটিশ সরকার ভারতীয় মুসলমানদের দেয়া প্ৰতিশ্ৰুতি ভঙ্গ করে এবং তুরস্ককে ভেঙে টুকরো টুকরো করে মুসলমানদের মনে এক প্রবল আঘাত হানে। এ কারণে তাদের মনে আগুন জ্বলে ওঠে। তুর্কী সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা এবং খেলাফতের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য ১৯১৯ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ নেতৃবর্গ যে আন্দোলন শুরু করেন তা ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে পরিচিত।

খেলাফতের প্রথম অধিবেশন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের অধিবেশনে তুরস্কের অখণ্ডতা ও খলিফার মর্যাদা রক্ষার দাবি জানানো হয়। খেলাফতের দ্বিতীয় অধিবেশন লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা শওকত আলী। এ অধিবেশনে তুরস্ক ও খলিফার ব্যাপারে মুসলমানদের মনোভাব সরকারকে জানানোর জন্য বড় লাট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। খেলাফতের ব্যাপারে বড় লাট তাঁদের কোনোরূপ আশ্বাস দিতে অসমর্থ হন। খেলাফত প্রতিনিধিগণ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড জর্জের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়ে ব্যর্থ হন।

তুরস্কের উপর সেভার্স চুক্তি চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে মুসলমানগণ ৩১ আগস্ট খিলাফত দিবস পালন করেন। খেলাফত কমিটিতে অসহযোগ কর্মসূচি গৃহীত হয়। খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ সম্মিলিতভাবে মাওলানা মোহাম্মাদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।

উদ্দেশ্য সিদ্ধির পূর্বেই কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনার কারণে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দেন, কিন্তু মাওলানা মোহাম্মাদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় খেলাফত আন্দোলন চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯২৪ সালে কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের খেলাফত উঠিয়ে দিয়ে সাধারণতন্ত্র প্রচলন করলে খেলাফত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

ফলাফল

খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এ আন্দোলন মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করে তোলে। এ আন্দোলন মুসলমানদের গণ-আন্দোলনের উপায় শিক্ষা দেয় এবং বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একতার মনোভাব জাগিয়ে তোলে। এ আন্দোলন পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের শক্তি বৃদ্ধি করে।

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!