হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ও খাদিজা (রা.) এর বিবাহ

এই উচ্চ বংশজাত ও করুণাময়ী রমণী খাদিজা তাঁর পূর্ব-প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে দ্বিগুণ সম্মানী দিয়ে পুরস্কৃত করলেন। এরপর থেকে তিনি তাঁর মনের মধ্যে একটি ধারণাই পোষণ করতে লাগলেন যে কিভাবে তাঁর যাবতীয় ধন-সম্পত্তির দেখা-শোনার দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পণ করা যায়। এ কাজ করাতে হলে যে পন্থা সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত তাহলো তাঁর সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি মাত্র প্রতিবন্ধকতা ছিল যা উভয়ের বয়সের তারতম্য। ঐ সময়ে হযরত মোহাম্মদ (সঃ) সবেমাত্র ২৫ বছরে পদার্পণ করেন আর বিবি খাদিজার বয়স তখন ৪০ বছর পার হয় হয়। তদসত্ত্বেও, শহরের অধিকাংশ বিবাহযোগ্যা যুবতীদের চেয়েও সৌন্দর্য ও অংগ-সৌষ্ঠবে কোন অংশে বিবি খাদিজা কম ছিলেন না। তাই তাঁর বয়স বিবাহের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতাই হতে পারে নাই। বিবাহের ক্ষেত্রে তিনি অতিশয় লোভনীয় ছিলেন এই কারণে যে, তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলী, হৃদয়গ্রাহী চাল-চলন, সুন্দর স্বভাব, চারিত্রিক সততা এবং উচ্চ বংশের গরিমা অতিশয় উচ্চ পর্যায়ের ছিল; এক্ষেত্রে তাঁর ধন-সম্পদের কোন প্রভাব ছিল না। সেকালে আরব দেশের প্রথা ছিল বরপক্ষ কনেকে যৌতুক দেবেন, অপরপক্ষে বর পাত্রীপক্ষ থেকে কোন কিছুই নিতে পারবেন না। বিবি খাদিজার পিতা খোয়ালিদ-বিন-আসাদ বিন আবদুল ওজ্জা, বিন-কুসেই, বিন-কিলাব, বিন-মোরা, বিন-কাব, বিন-লাওয়াই, বিন-গালিব ছিলেন খুবই উচ্চ বংশজাত।

যে সমস্ত পাণিপ্রার্থী অর্থের বাহুল্য এবং বংশগরিমার জোরে বিবি খাদিজার সামনে চমক সৃষ্টি করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন, তাঁদের কাছে বিবি খাদিজা ছিলেন সম্রাজ্ঞীতুল্য। কিন্তু তাঁদের সব প্রচেষ্টাই বৃথা গেল। খাদিজার দ্বিতীয় স্বামী আবু হালার মৃত্যুর পর এটা মনে হয়েছিল যে, তিনি তৃতীয় বাবের মত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন না। কিন্তু তিনি হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে দেখলেন এবং তাঁর নৈতিক গুণাবলীর প্রশংসা শুনতে পেলেন, তখন থেকেই তাঁর মনের দৃঢ়তা দুর্বল হতে লাগল। তাঁর যে আন্তরিক আকর্ষণ তাতে হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দিকে তাঁকে আকৃষ্ট করতে লাগল, তা দিনে দিনে গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। তিনি তাঁকে বাজিয়ে দেখতে চাইলেন।

মাইসারা বলেছিলেন

“সিরিয়া থেকে আমাদের ফিরে আসার দু’মাস বিশ দিন পরে বিবি খাদিজা আমাকে আমার ওস্তাদ হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর কাছে পাঠালেন। আমি ওস্তাদকে প্রশ্ন করলাম, “হে মোহাম্মদ! আপনার অবিবাহিত থাকার কারণ কি?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘এখন আমার হাত একেবারে খালি । বাগদত্তা কনেকে যৌতুক দেয়ার মত প্রয়োজনীয় অর্থাদি আমার নেই।’— আমি বললাম, ‘আপনার সামান্যতম যা আছে তাতেই যদি কোন ধনাঢ্য, সুযোগ্যা এবং সম্ভ্রান্ত নারী যথেষ্ট মনে করেন, তখন আপনি কি করবেন?’ তিনি বললেন, ‘তুমি কার ইংগিত দিচ্ছো?’ আমি বললাম, ‘তিনি বিবি খাদিজা।’ তিনি বললেন, ‘আমার সংগে তামাশা করছো কেন? আমার যে সামান্যতম কিছু আছে তা দিয়ে কোন্ সাহসে আমি তাঁর সান্নিধ্য কামনা করবো এবং তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিব?’ আমি বললাম, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি সব ব্যবস্থা করবো।’ আমার ওস্তাদের কথা শুনে এবং ভাব-ভংগি দেখে বিবি খাদিজার প্রতি তাঁর অনুভূতি বুঝতে পেরেছিলাম। কালবিলম্ব না করে আমি বিবি খাদিজাকে নিভৃতে ডেকে নিয়ে সব কথা খুলে বললাম। তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ত্বরিৎ বিবাহের সকল ব্যবস্থার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।”

এর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর চাচা আবু তালিবসহ কয়েকজন পিতৃত্ব। খাদিজা (রাঃ)-এর চাচা আমর ইবনে আসাদের বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে ভাতিজা মোহাম্মদ (সঃ)- এর পক্ষ থেকে খাদিজা (রাঃ)-এর বিয়ের প্রস্তাব দেন। উল্লেখ্য যে খাদিজা (রাঃ)-এর পিতা ইতিপূর্বেই লোকান্তরিত হয়েছিলেন। উভয় পক্ষের অভিভাবকগণের যথারীতি প্রস্তাব ও আলোচনা ফলপ্রসু হল। উভয়পক্ষই সম্মত হলেন। খাদীজার সম্মতির ভিত্তিতে আমর ইবনে আসাদ আবু তালিবের প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন। আবু তালিব তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাতিজা হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর পক্ষে তাঁর বক্তব্য রেখে বললেন— “সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত বনি হাশেম বংশীয়দের অর্থাৎ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর পবিত্র কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের ভার এবং পবিত্র মক্কা প্রদেশের শাসনভার আমাদের উপর অর্পণ করেছেন। তিনি এই সংগে আমাদের সকল আরব জাতির নেতা বানিয়েছেন। এখানে আপনার সামনে ভ্রাতুষ্পুত্র মোহাম্মদ-বিন-আবদুল্লাহ্ উপস্থিত রয়েছেন। তাঁর সংগে গুণে, মানে ও মহত্বে কোন লোকই একপাল্লায় ওজন হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাঁর স্থান সকলের উপরে। যদিও সে বিত্তশালী নয়, তবু একথা মনে রাখা দরকার যে, ধন-সম্পদ অপসূয়মাণ ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন তার আত্মা যেহেতু খাদিজার মত মহতী মহিলার দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং খাদিজার আত্মাও যখন তার দিকে অনুরূপভাবে ঝুঁকে পড়েছে তখন এ মুহূর্তে তার প্রার্থনা যে আপনি নিজ গুণে আপনার কন্যাকে মোহাম্মদ (সঃ)-এর স্ত্রী হিসেবে তার হাতে তুলে দিন। যৌতুক হিসেবে বর এনেছেন বিশটি মাদী উট। আর নগদ এবং দেন- মোহরানার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম। হে আমার কোরাইশ ভ্রাতৃবৃন্দ! আমি আপনাদেরও আমার সাক্ষী মানছি।”

খাদিজার পক্ষে তাঁর আত্মীয় খ্রিস্টান সাধু ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল আবু তালিবের বক্তব্যের প্রতি-ভাষণে বললেন, “আপনি আমাদের কাছে বিধাতার যেসমস্ত অনুগ্রহের কথা বলেছেন তা বর্ণে বর্ণে সত্য। পক্ষান্তরে, আপনাদের বংশের মর্যাদা এবং সমস্ত আরব দেশের উপর আপনাদের প্রভাব প্রতিপত্তি সর্বজনবিদিত। আপনাদের সংগে আত্মীয়তা করার জন্যে আমরা সকলে আগ্রহান্বিত। অতএব, হে কোরাইশ প্রধানগণ! আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমরা মোহাম্মদ (সঃ)-এর সংগে খাদিজার বিবাহে সম্মতি প্রদান করছি।” এভাবেই ‘আল-আমীন’ ও তাহেরার শুভ-বিবাহ সম্পন্ন হল। শুচিতা, সম্ভ্রম এবং শুদ্ধাচারের জন্যে খাদিজাকে তাহেরা বলা হতো।

এর পরই কা’বা ঘরের নিকট মক্কা নগরীর মূল কেন্দ্রে খাদীজা (রাঃ)-এর বাড়ীতে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) বসবাস করতে থাকেন। সে বাড়ীতে হযরত ফাতিমা (রাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। বাড়ীটি আজ পর্যন্ত পূর্ণভূমি হিসাবে মানুষের নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়ে আছে। এই বিবাহ হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর পয়গাম্বর জীবনের আয়োজন মাত্র। হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের বিকাশ ও স্বার্থকতার জন্য খাদিজা (রাঃ)-এর সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন ছিল, তাই আল্লাহ এমনভাবে মিলন সংঘটিত করিয়া নি। খাদিজা (রাঃ) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন মোহাম্মদ (স:) বनाহ করেননি।

মহান আল্লাহর অনুগ্রহে এ বরকতময় বিয়ের পর হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হন। কিন্তু খাদীজা (রাঃ)-এর ইচ্ছানুসারে ব্যবসার উন্নতি ও সম্পদ বৃদ্ধির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর নিয়ামত সমূহের চিন্তা, অধিক পরিমাণে আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর কৃতজ্ঞজ্ঞতার প্রকাশ এবং এক আল্লাহর ইবাদতে তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।

এ মনোহর অনুষ্ঠানে যথাযথভাবে বিবাহ উৎসব পালন করার জন্যে বিবি খাদিজা তাঁর সুশ্রী তরুণ ক্রীতদাসদের তবলার তালে তালে নৃত্য করতে বললেন। নর্তকের দল একত্রিত হওয়ার আগেই সকলে দু’টি মহান পরিবারের মিলনে অতিশয় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন।

বিবি খাদিজা মোহাম্মদ (সঃ)-এর প্রথমা স্ত্রী। তিনি তাঁর মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তাঁর স্বামীর অন্তরে আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বির সাক্ষাত পাননি। তিনিই ছিলেন তাঁর স্বামীর একমাত্র প্রিয়তমা স্ত্রী। তাঁর সন্তান-সন্তুতির মোট সংখ্যা ছিল সাত; — এর মধ্যে তিনজন পুত্র এবং চারজন কন্যা। আল-কাসিম, আল-তাহির এবং আল-তৈয়েব পুত্র আর কন্যারা হলেন রোকাইয়া, ফাতিমা, জয়নাব ও উম্মে কুলসুম।

জ্যেষ্ঠ পুত্র আল-কাসিমের জন্মের পরে পারিবারিক ডাকনাম ‘আবদুল কাসিম’ অর্থাৎ‍ কাসিমের পিতা শব্দটি হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর উপর আরোপ করা হয়। নতুন বংশধরের আগমনে তাঁর পরিবারে আনন্দের ঢেউ খেলে গিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত হতভাগ্য প্রথম সন্তান যে পিতার একান্ত আদরের ছিল সে শিশু-বয়সেই মারা গিয়েছিল। অপর দুই ভাই আল-তাহির ও আল-তৈয়েব একই ভাগ্য বরণ করেছিল। তখন মক্কায় চলছিল অন্ধকারের যুগ। কেবলমাত্র হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর কন্যারাই ইসলামের আগমন দেখতে পেয়েছিলেন এবং তাঁরা ইসলামের একনিষ্ঠ বিশ্বস্ত অনুসারী বলে বিবেচিত হয়েছিলেন।

পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!