দেওবন্দ আন্দোলন

ব্রিটিশ বেনিয়ারা মুসলমানদের কাছে থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পরে ব্রিটিশ তাদের ক্ষমতা সুসংহত করতে বিভিন্ন কলাকৌশল অবলম্বন করে। মুসলমানদের নিকট থেকে ক্ষমতা হস্তগত করার কারণে সঙ্গত কারণেই ব্রিটিশরা মুসলমানদের তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে। মুসলমানরা রাজ্যহারা হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, অসহযোগ, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের সূচনা করে। তারা ভারতবর্ষে নিজেদের সামাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য বিভাজন নীতি চালু করে।

বিভিন্ন পর্যায়ে তারা এ কৌশলের সুফলও ভোগ করে। স্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ সুবিধাভোগী জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয় এবং ইংরেজি শিক্ষিতদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তারা আরেকটি অনুগত শ্রেণি সৃষ্টির প্রয়াস প্রায়।

কিন্তু চিরবিদ্রোহী মুসলিম সম্প্রদায়ের হক্কানী উলামায়ে কেরাম প্রতিটি পর্যায়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তাদের আযাদীর সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৮০৩ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক উপমহাদেশের স্বাধীনতা হরণের পর থেকে উলামায়ে কেরামের আযাদী সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। প্রথম এ আন্দোলনের সূচনা করেন সেকালের শ্রেষ্ঠ আলেম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.)। এ মহামনীষীর মৃত্যুর পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী (রহ.) এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি ব্রিটিশকে ভারত জবরদখলকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিতাড়নের জন্য ‘জেহাদ ফরজ’ হওয়ার ফতোয়া জারি করেন।

এ ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর সুযোগ্য শাগরেদ সাইয়েদ আহমদ বেরেলবী (রহ.) এ আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে দেন। এ বীর মুজাহিদের নেতৃত্ব ১৮৩১ সালে বালাকোটের ময়দানে বৃটিশ বাহিনী ও শিখদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুজাহিদ বাহিনীর বিপর্যয় ঘটে। অগণিত মুজাহিদের রক্তে বালাকোটের ময়দান প্লাবিত হয়। সাময়িকভাবে আযাদী আন্দোলনে ভাটা পড়লেও ১৮৫৭ সালে আবার ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।

এ মহাবিদ্রোহ সংঘটনে বিশ্ববিখ্যাত উলামায়ে কেরাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশ অত্যন্ত নির্মমভাবে এ বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার আলেম ও আযাদী পাগল বীর

সিপাহীদের প্রকাশ্যে গাছে লটকিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়।

এরপর মুসলিম জাতির ওপরে নেমে আসে দুঃখ, দুর্দশা ও দুর্গতি। তখন সচেতন ও দূরদর্শী উলামায়ে কেরাম লড়াই ও সংগ্রামের ভিন্ন পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। এ পর্যায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে ১৮৬৭ সনে হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে ছাত্তা মসজিদের ডালিম গাছের নিচে “দারুল উলূম দেওবন্দ”-এর উদ্বোধন করেন। এটি ছিল বিশ্বস্ত কর্মীবাহিনী গঠনে সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার অংশবিশেষ। পরবর্তীকালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ প্রশিক্ষিত কর্মী বের হয়ে আযাদী আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দান করেন। এ প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠ উপহার হলেন শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান (রহ.)। তিনি ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের পতনের জন্য এক মহাপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা বাস্তবায়নের আগেই এ দেশীয় এজেন্টদের বিশ্বাসঘাতকতায় ফাস হয়ে যায়। শায়খুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান ব্রিটিশের হাতে বন্দী ও মাল্টায় নির্বাসিত হন। এ পথ ধরেই ভারতবাসী ফিরে পায় আযাদী আন্দোলনের নব প্রেরণা ও উদ্দীপনা। ইতিহাসে এটি ‘রেশমী রুমাল আন্দোলন’ নামে সুপ্রসিদ্ধ।

অসহযোগ আন্দোলন

শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (রহ.) তিন বছর সাত মাস কারাজীবন শেষ করে ৮ই জুন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি লাভ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল। ইংরেজ সরকার তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।

শায়খুল হিন্দ (রহ.) দীর্ঘকাল কারাভোগের পরও মানসিক দিক থেকে কোনো দুর্বলতার শিকার হননি; বরং নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ভারতকে স্বাধীন করার জন্য তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে গণবিপ্লর সংঘটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর মিসর-এর মাল্টা থেকে বোম্বাই পৌঁছার পর তিনি খেলাফত কমিটির সদস্যবৃন্দ ও মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখনই খেলাফত কমিটি ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্ল্যাটফরম থেকে অসহযোগ আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ নতুন সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটিয়ে তিনি তরকে মুয়ালায়াত (অসহযোগ আন্দোলন)-এর ফতোয়ায় শীর্ষস্থানীয় পাঁচশ আলেমের দস্তখতসহ এটি সারা দেশে প্রচার করেন। এখানে স্মরণ রাখা একান্ত প্রয়োজন, খিলাফত কমিটির রাজনৈতিক সাফল্য তরকে মুয়ালায়াত-এর মাধ্যমেই হাসিল হয় এবং বহু প্রতীক্ষিত খিলাফত কমিটিও গঠিত হয়। শায়খুল হিন্দ (রহ.) এর আন্দোলনের ফলে এ খিলাফত কমিটি গঠিত হওয়ার পরেই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠিত হয়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় এ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, খিলাফত কমিটি দেশবাসীর কাছে অসহযোগ আন্দোলনের চিন্তাধারা’ পেশ করেছে। এটা ছিল অসহায় ভারতবাসীর হাতে বিজয়ের নির্ভুল অস্ত্র। খেলাফত কমিটি অতিশয় হতাশা ও নৈরাশ্যজনক পরিবেশে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। অবশেষে উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কংগ্রেসও অসহযোগ আন্দোলনের নতুন সংগ্রাম পদ্ধতি গ্রহণ করার জন্য একমত হয়। পরিশেষে এটাই তাদের আন্দোলনে অভীষ্ট লক্ষ্যে পরিণত করে। প্রথমদিকে খেলাফত কমিটির দেয়া অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচিকে একটি বিদআত মনে করা হতো। পরবর্তীকালে ভারতবাসীর মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথম দিকে কেবল মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু পরে সমগ্র ভারতবাসী এ বিষয়ে একই সুরে কথা বলেতে শুরু করে।

খিলাফত কমিটির কারণেই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন সম্ভব হয়েছে এবং খেলাফত কমিটির দ্বারা এর জন্ম হয়েছে। অতএব, তাদের আন্দোলনের ফলাফলও প্রকৃতপক্ষে খেলাফত কমিটির দাওয়াতেরই ফসল। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি

নিম্নলিখিত চারটি বিষয়ে বৃটিশ সরকারকে বয়কট করাই অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যথাঃ-
  1. সরকারি খেতাব ও সনদ বর্জন করা।
  2. সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জন, অর্থাৎ নিজেও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করবে। না আর সন্তান-সন্ততিদেরও শিক্ষা গ্রহণের জন্য সেখানে পাঠাবে না।
  3. কাউন্সিল বর্জন অর্থাৎ কাউন্সিল থেকে কেউ কোনোভাবে উপকৃত হবে না।
  4. সরকারি আদালত বর্জন, অর্থাৎ কেউ সরকারি আদালতে কোনো মামলা-মকদ্দমা করবে না এবং ওকালতী মোখতারীও করবে না।
 
 
পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!