হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর বক্ষ বিদারণ

একদিন সকালবেলা হযরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর দুধ-ভাইকে সংগে নিয়ে পালক পিতার পশুপালকে চারণভূমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বের হলেন ঃ

“দিনের প্রায় মধ্যভাগে শিশু-নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর দুধভাই হঠাৎ এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে। সে তার পিতা-মাতাকে চিৎকার দিয়ে ডেকে ভীত সন্ত্রস্ত স্বরে বলতে লাগল, “তোমারা তাড়াতাড়ি এসো। আমার কোরাইশী ভাইকে সাদা কাপড়-পরা দু’জন লোক মাটিতে শুইয়ে তাঁর বুক চিরে দু’ফালা করে ফেলেছে।”

ভয়ে পাগলের মত হয়ে হালিমা ও তাঁর স্বামী যথাশক্তি দৌড়াতে দৌড়াতে নবী (সঃ) এর দুধভাইকে অনুসরণ করে সেখানে পৌঁছলেন। সেখানে মোহাম্মদ (সঃ)-কে একটি পাহাড়ের উপর বসে থাকতে দেখলেন। তাঁকে সম্পূর্ণ শান্ত দেখাচ্ছিল; কিন্তু তাঁর মুখমণ্ডল এক অশুভ মেদুরতার বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। তাঁরা তাঁকে আদর করে একের পর এক প্রশ্ন করে বলতে লাগলেন,

“ও বাছা, তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ? তোমার ভাগ্যে কি ঘটেছে?” শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এসব প্রশ্নের জবাবে বললো, “আমি যখন মেষপালের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছিলাম, সেই সময় শুভ্রমূর্তির মত দু’জনের আবির্ভাব ঘটল। প্রথমে আমি ঐ দু’টিকে বিরাটকায় পাখি মনে করেছিলাম। কাছে আসতে ভুল ভাঙল। তাঁরা ধবধবে উজ্জ্বল সাদা পোশাক পরিহিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন আমাকে ইংগিত করে অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই কি সেই বালক? তিনি জবাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, এই সেই বালক। যখন আমি ভয়ে ভীত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম তখন তাঁরা জোর করে ধরে আমাকে শুইয়ে দিয়ে বুক চিরে ফেললেন। তারপর তাঁরা আমার হৃৎপিণ্ড থেকে জমাট বাঁধা এক কালো রক্তপিণ্ড বের করে বহুদূরে ফেলে দিলেন। এরপর তাঁরা আমার বুক বন্ধ করে দিয়ে ছায়ামূর্তির মত চলে গেলেন।”

বক্ষ বিদারণ ঘটনা সম্বন্ধে পবিত্র কোরআন শরীফের ৯৪ নম্বর সূরায় মহান আল্লাহপাক বলেছেনঃ

“আমরা কি তোমার বক্ষ প্রশস্ত করিনি এবং তোমার মধ্য থেকে তোমার ভার লাঘব করিনি, যে ভার তোমার পৃষ্ঠকে অবনত করিয়াছিল? আমরা তোমার জন্যে তোমার মর্যাদাকে মহিমান্বিত করিয়াছি।”

আল কোরআন ৯৪ঃ ১-৪

এই ঘটনাটি পরে আলোচিত অনেক ঘটনার সংগে রূপক কাহিনী হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। এসব ঘটনার তাৎপর্য এই যে, হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর খুব অল্প বয়সে আল্লাহপাক তাঁর বুক খুলে দিয়েছিলেন একেশ্বরবাদী সত্যের আনন্দকে গ্রহণ করার জন্যে। এ আনন্দ তাঁর সারা দেহমনে প্রতিবিম্বত হয়ে মূর্তিপূজার ভারমুক্ত হতে সাহায্য করেছিল ।

শিশু-নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) -এর পালক পিতা-মাতা তাঁকে নিয়ে হতবাক অবস্থায় দিন কাটাতে লাগলেন। হারিস তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “আমি ভীত হচ্ছি এই ভেবে যে, ছেলেটি স্পষ্টত প্রতিবেশীর যাদু-টোনা দ্বারা অসুস্থ হয়েছে। বালকটি আমাদের জন্যে যে সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ বহন করে নিয়ে এসেছে সেজন্যে তারা তাতে ঈর্ষান্বিত হয়ে যাদু করেছে। কিন্তু তার উপর কোন অশুভ শক্তির আছর হয়েছে কিনা, অথবা বালকটি যা দেখেছে তা-ই সত্য কিনা তা নির্ণয় করা আমাদের মুখ্য দায়িত্ব। সে যা দেখেছে তা গৌরবময় ভবিষ্যতের ইংগিত বহন করে। আরো খারাপ কিছু ঘটার আগেই চল ওকে তার পরিবারের কাছে ফেরত দিয়ে আসি।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও হালিমা এই অকাট্য যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে শিশু মোহাম্মদ (সঃ)- কে সংগে নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন।

চার বছরের শিশুটি তাঁদের পাশে পাশে চলতে চলতে শহরের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছল। তাঁরা দেখতে পেল একদল লোক ঐ পথে বাজারে বা কা’বার উদ্দেশ্যে চলেছে। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। তারা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লো। বিবি হালিমা শিগগিরই তাঁর পালক-সন্তান হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। শিশু মোহাম্মদ (সঃ)-কে অন্ধকারের মধ্যে অনেক খোঁজাখুঁজি ও ডাকাডাকি করেও খুঁজে পেলেন না। সময় নষ্ট না করে হালিমা দ্রুত আবদুল মোত্তালিবকে বিষয়টি অবহিত করলেন। তিনি ছিলেন সমাজের একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। তাই তিনি সহজেই একদল দক্ষ ব্যক্তিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে তাঁর নাতিকে খুঁজে বের করার জন্য পাঠালেন এবং তিনি স্বয়ং ঐ দলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন।

একজন অনুসন্ধানকারী ‘তিয়ামম্’ জলপ্রপাত-সংলগ্ন কতকগুলো ঝোপের পাশে একটি শিশুকে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি সানন্দচিত্তে একটি বৃক্ষ-শাখা টেনে ধরে বালকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বালক, তুমি কে?” সে জবাব দিল, “আমার নাম মোহাম্মদ। আমি আবদুল্লাহ-বিন-আবদুল মোত্তালিবের পুত্র।” ছেলেটিকে পেয়ে লোকটি খুশিতে গদ গদ হয়ে তাঁকে কোলে তুলে নিলেন এবং তাঁকে কোলে করে তাঁর দাদার কাছে নিয়ে গেলেন। তখন আবদুল মোত্তালিব ঘোড়ার পিঠের উপর খোলা তরবারি নিয়ে বসা অবস্থায় মোহাম্মদ (সঃ)- কে সস্নেহে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁকে মক্কায় নিয়ে গেলেন। নাতিকে পাওয়ার আনন্দে বৃদ্ধ দাদা কয়েকটি ভেড়া ও দুম্বা জবাই করলেন এবং নগরীর গরিব-দুঃখীদের মাঝে সেই সমস্ত পশুর গোস্ত বিতরণ করলেন। এরপর তিনি নাতিকে কাঁধে তুলে নিলেন এবং দ্রুত পদক্ষেপে ধর্মীয় রীতি অনুসারে কা’বাঘরের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে মহান আল্লাহ্পাকের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণামুক্ত অভাগিনী হালিমাকে সংগে নিয়ে তিনি (আবদুল মোত্তালিব ) মোহাম্মদ (সঃ)-কে তাঁর মাতা বিবি আমিনা বেগমের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। স্নেহশীলা মাতা খুশিতে আত্মহারা হয়ে হালিমাকে বললেন, “এটা আপনার কোন ধরনের কাজ? ও দাইমা, এর আগে আপনি আমার সন্তানকে কাছে রাখার জন্যে যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, এখন এমন কি ঘটেছে যে জন্যে আপনি তাকে আমার কাছে ফেরত নিয়ে এসছেন?”, – হালিমা প্রতিউত্তরে বললেন, “আমি মনে করি, সে এখন বেড়ে উঠেছে। তাই আমি আগের চেয়ে তার জন্যে বেশি কিছু করতে পারব না। যে-কোন দুর্ঘটনার ভয়ে আমি তাকে আপনার কাছে ফেরত নিয়ে এসেছি যাতে আপনার চোখের সামনে সে বড় হতে পারে।”

তদসত্ত্বেও হালিমার মুখমণ্ডলে বিহ্বলতা ও বিষণ্নতার ছাপ লক্ষ্য করা গেল। তাঁর কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে বিবি আমিনা জিজ্ঞাসা করলেন, “তাঁকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আপনি নিশ্চয়ই কিছু গোপন করছেন। আমাকে সব কিছু খুলে বলুন। “

তখন হালিমা মনে করলেন, তাঁর স্বামী তাকে যা আগেই বলেছিলেন সে কথা তাকে এখন বলাই উত্তম। তিনি বিবি আমিনার নিকট ঘটনাটি খুলে বললেন। ফলে আমিনার মাতৃসুলভ মানসিকতা দারুণভাবে আহত হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিউত্তর দিয়ে বললেন, “আপনার কি ধারণা যে আমার ছেলে শয়তানের প্রভাবে পড়েছে বলে ভয় করছেন?” হালিমা বললেন, “আমি সেই ভয়ই করছি।” আমিনা বললেন, “জেনে রাখুন, শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই ওর ক্ষতি করার। কারণ এক গৌরবময় ভবিষ্যৎ ওর জন্যে অপেক্ষা করছে।” বিবি আমিনা তখন শিশু মোহাম্মদ (সঃ) গর্ভে থাকা অবস্থার অলৌকিক ঘটনাগুলো হালিমাকে জানালেন। এরপর তিনি হালিমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং তাঁকে পুরস্কৃত করে তাঁর শিশু মোহাম্মদ (সঃ)-কে গভীর মাতৃস্নেহে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও মুক্ত বাতাসে শক্তিশালী জীবন গঠন করার জন্যে তৈরি হলেন। এখন নগরীর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্যে আর ভয় রইলো না।

পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!