বিবি আমিনার ইন্তেকাল এবং বহিরা পাদরীর সাথে শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এর সাক্ষাত

স্নেহময়ী মায়ের আদরে শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এক সুদর্শন এবং বুদ্ধিমান বালকরূপে বড় হতে লাগলেন। কিন্তু মায়ের স্নেহ ও ভালবাসা বেশিদিন তিনি ভোগ করতে পারেননি। কারণ তাঁর মা-ও তাঁকে নিয়ে মক্কা ফেরার পথে মদিনা থেকে কিছু দূরে ‘আল-আওয়া’ নামক স্থানে অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং সেই স্থানে অবস্থানকালে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই মা আমিনা ইন্তেকাল করেন, তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়।

কাফ্রী দাসী উম্মে আয়মা প্রায় সাত বছরের বালক মোহাম্মদ (সঃ) কে মক্কায় নিয়ে এলেন। তিনি এই ছোট নবী (সঃ)-এর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। সংগে আনা পাঁচটি উটসহ তার একমাত্র উত্তরাধিকার হয়ে গেলেন শিশু নবী মোহাম্মদ (সঃ)।

শিশু মোহাম্মদ (সঃ)-কে তাঁর দাদা আবদুল মোত্তালিবের হাতে সমর্পণ করা হলো। নাতির প্রতি সবসময় ছিল তাঁর অগাধ স্নেহ। শিশু মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর পিতা আবদুল্লাহ’র মত যত বড় হতে লাগলেন, তাঁর দাদার স্নেহ দিনের পর দিন ততই বাড়তে লাগল। কিন্তু তিনি তাঁর নাতির এ বৃদ্ধি দেখে খুশি হননি।

নাতির প্রতি আবদুল মোত্তালিবের স্নেহ কত গভীর ছিল সে সম্পর্কে পরবর্তী বিবরণী থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। অন্যান্য মরুভূমি শহরের রাস্তারমত মক্কা নগরীর রাস্তাগুলোও ছিল সংকীর্ণ ও বাঁকা। কেবলমাত্র সেখানে একটি যে-কোন আয়তনের ফাঁকা জায়গা ছিল – এ বর্গ ক্ষেত্রাকার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পবিত্র কা’বাঘর। সকাল-সন্ধ্যা এখানে নগরবাসীরা একত্রিত হয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করে, তাদের ব্যবসা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে এবং প্রার্থনা সমাধা করে। এমন একদিনও অতিবাহিত হয়নি যেদিন আবদুল মোত্তালিবের ভৃত্যরা কাবাঘরের চতুরে কার্পেট না বিছিয়েছে। বিছানা-কম্বলের চারপাশ ঘিরে বসে থাকতেন তাঁর পুত্র, নাতি ও শহরের নেতৃস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, — এবং তাঁরা সকলেই তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় থাকতেন। পবিত্র কা’বাঘরের তত্ত্বাবধায়ককে এত বেশি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হতো যে তাঁর পা’-কে কার্পেটের বহিঃসীমায় ফেলতে দেয়া হতো না।

একদিনের এক ঘটনা কিশোর মোহাম্মদ (সঃ) একদিন পবিত্র কার্পেটের ঠিক মাঝখানে অবস্থান নিয়ে বসলেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে তাঁর চাচারা তাঁকে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরিয়ে নিলেন। ঠিক ঐ সময় আবদুল মোত্তালিব সেখানে আসছিলেন। তিনি দূর থেকে ঐ বৈরী ঘটনা অবলোকন করলেন। এ ঘটনা দেখে তিনি উচ্চ স্বরে বলে উঠলেন, “আমার নাতি যেখানে বসেছিল – তাঁকে ঠিক সে জায়গাতেই বসিয়ে দেয়া হোক।” তিনি আরও বললেন, “সে-ই তো আমার বৃদ্ধকালের আনন্দ; তাঁর এ বিশাল স্পর্ধা জেগে উঠেছে তাঁর নিয়তির পূর্বলক্ষণ থেকে। কারণ তিনি নিশ্চয়ই একদিন উচ্চ-পদমর্যাদার অধিকারী হবেন যে পদমর্যাদা কোন আরবীয়ের কপালে এ-যাবৎ জোটেনি।

একথা বলে তিনি হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-কে তাঁর পাশে বসালেন এবং তাঁর গণ্ডদেশে

ও কাঁধে হাত বুলিয়ে সোহাগ করতে লাগলেন। সোহাগের আতিশয্যে বালক মোহাম্মদ (সঃ) বাক্যহারা হয়ে পড়লেন। পুনরায় নিয়তির নির্দেশে হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এধরনের বিনম্র ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হলেন। পঁচানব্বই বছর বয়সে আবদুল মোত্তালিব পার্থিব জগৎ হতে বিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুর

পরে সকল সহ নগরবাসী তাঁর পূর্ব-কার্যকলাপের জন্যে একত্রে তাঁকে নিন্দা জ্ঞাপন করেছে।

হতভাগ্য অনাথ শিশুটিকে লালন-পালনের দায়িত্ব তাঁর চাচা আবু তালিব গ্রহণ করলেন। দাদা আবদুল মোত্তালিব এরূপ সদয়-সহযোগিতার কাজে আবু তালিবকে পূর্বেই নির্বাচিত করেছিলেন এই কারণে যে, তিনিই চাচাদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। তাছাড়া এই সময় পর্যন্ত আবু তালিব নিঃসন্তান ছিলেন এবং আবু তালিবের স্ত্রী ফাতিমা ছিলেন আবু তালিব এবং আব্দুল্লাহ’র আপন চাচাতো বোন। অর্থাৎ ফাতিমা ছিলেন মোহাম্মদ (সঃ)-এর ফুফু।

হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর প্রথম সিরিয়া ভ্রমণ (৫৮২ খ্রিঃ)

আবু তালিবের পরিবারের আকার ছিল বড় এবং আর্থিকভাবে ছিল দুর্বল। তাই পবিত্র কা’বাঘরের পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যাস্ত থাকলেও তিনি কিছুটা বাধ্য হয়েই ইয়েমেন ও সিরিয়া প্রদেশের সংগে ব্যবসা করতেন।

ভ্রাতুষ্পুত্রকে বাড়িতে ঠাঁই দেয়ার অল্পকাল পরে কোরাইশ গোত্রভুক্ত লোকদের নিয়ে তিনি কাফেলা তৈরি করার কাজে হাত দিলেন। কাফেলাকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং কাফেলার লোকদের তাঁবুতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তাঁকেই বহন করতে হত।

সবকিছু প্রস্তুতি নিয়ে বস্তু-সমাগ্রীকে ভাগ করে হাঁটু গেড়ে-বসা উটের পিঠে ঠিক ঠিক ভাবে তুলে দড়ি দিয়ে বাঁধা হল। এ সময় উটগুলো তাদের স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসের ধারায় গৌত গোঁত শব্দ করতে লাগল। গুঁতো দিয়ে এবং শব্দ করে তাদের জোর করে দাঁড় করানো হল এবং তারা দীর্ঘ ও দৃঢ় পদক্ষেপে যাত্রা শুরু করলো উত্তরদিকে। এই দৃশ্য হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কে স্মরণ করিয়ে দিল তাঁর প্রিয় বাদিয়ার কথা, যেখানকার কাফেলাগুলোকে ঠিক ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে এই কাফেলা তুল্য বলে মনে হল। এখান দিয়ে কাফেলা অনবরত এদিকে সেদিকে যাতায়াত করত। এ এক নতুন বিচ্ছেদ। এ সময়ের বিচ্ছেদ চাচার নৈকট্য থেকে। চাচার কাছ থেকে বিচ্ছেদের ভাবনা তাঁকে নিঃসংগতার বেদনায় প্রায় নিমজ্জিত করে ফেলল। তিনি নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর সারা অবয়বে নীরব বিষণ্নতার ছায়া খেলে গেল। অবশেষে ভগ্নহৃদয়ে তিনি আবু তালিবের বুকে ঝুঁকে পড়লেন। আবু তালিব তাঁকে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললেন। তিনিও তাঁর কচি বাহু দিয়ে আবু তালিবকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চাচার আলখিল্লার ভাঁজে মুখ লুকালেন। এ সময়ে আশা-নিরাশার ছোঁয়ায় তাঁর চোখ বেয়ে যে অশ্রুধারা নেমে আসছিল তা গোপন করার জন্যেই তিনি আলখিল্লার ভাঁজে মুখ লুকিয়েছিলেন।

অনুরাগের এরূপ স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশে আবু তালিব একেবারে অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং তিনি অনুমান করলেন কত আন্তরিকভাবে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র তাঁর সংগী হতে অভিলাষ প্রকাশ করছে। তিনি ঘোষণা করলেন, “আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমরা তাকে আমাদের সংগে নিয়ে যাব। সে আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না এবং আমিও তাকে ছেড়ে থাকতে পারব না।”

এ কথায় বালক মোহাম্মদ (সঃ) আনন্দে চোখের পানি মুছে ফেললেন এবং সিরিয়া যাওয়ার জন্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। চাচার সংকেত পাওয়ামাত্র তিনি একটি উটের উপর চাচার পিছনে উঠে বসলেন।

যখন কাফেলা বেদুঈন গোত্রের সৃষ্ট পথ ধরে যাত্রা শুরু করল তখন বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার ফলে শিশু মোহাম্মদ (সঃ)-এর ফুসফুস সংকুচিত হয়ে উঠল। কিন্তু এভাবে সংকুচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যেহেতু বাদিয়ার জীবন-সঞ্জীবনী উন্মুক্ত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অভ্যস্ত ছিলেন সেহেতু তাঁর ফুসফুস স্বাচ্ছন্দ্যে বিস্তৃতি লাভ করতে পেরেছিল। বাল্যকাল থেকেই যাযাবর জীবনে অভ্যস্থ হওয়ার ফলে হেযায মরুভূমির মধ্যে অবিরাম যাত্রাজনিত পাণান্তক নিঃসংগতা এবং ভয়ংকর পিপাসাকে তরুণ অভিযাত্রী অসীম সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন।

বছরের বেশি সময় ধরে যে-সব দেশ তাঁরা অতিক্রম করেছিল, সে-সব দেশগুলো পাথর এবং বালুকার পটভূমিতে এত বেশি অভিন্ন ছিল যে কাফেলার পক্ষে ঐ সব দেশগুলোর স্বাতন্ত্র্য নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তাই মনে হয়েছিল যে, কাফেলা কেবলমাত্র সময়ের হিসেব রেখেই চলেছে। এই নিষ্করুণ মরুভূমিতে জীবনের কোন চিহ্ন ছিল না, ছিল কেবল সর্বব্যাপী শাশ্বত স্রষ্টার উপস্থিতি;- যা মরণশীল মানুষের পক্ষে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়। 

বাহিরা পাদরীর সাথে শিশু মোহাম্মদ (সঃ) এর সাক্ষাত

‘জবল হাওয়ান’ পর্বত-শ্রেণীর মধ্যবর্তী খাড়া পাহাড়ের শীর্ষদেশে একটি খ্রিস্টান মঠ অবস্থিত ছিল। এই মঠটি একজন দীর্ঘদেহী ব্যক্তির মাথায় জড়ানো পাগড়ির মত দেখাচ্ছিল। এই মঠে বাহিরা নামক এক জ্ঞানী ধর্মযাজক বাস করতেন, তিনি সিরিয়া থেকে আরবের দিকে বিস্তৃত সমতল ভূমির দিকে দৃষ্টিমেলে তাকালেন। হঠাৎ সাদা একখণ্ড আয়তাকার বিশাল মেঘ-রে উপর তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ হলো। এই মেঘ-খণ্ডে এক নির্মল নীলাভ আভা ছড়ানো ছিল। সেটি একটি বিশাল পাখির আকারে উত্তর দিকে আগত একটি কাফেলার ওপর ছায়াদান করে আসছিল। বাতাসে ভাসমান পশমী মেঘ-খন্ডটি ইতস্ততঃ পথযাত্রীদের ওপর নীলাভ ছায়া বিস্তার করে তাদের সংগী হয়ে ভেসে চলছিল।

যে পাহাড়ের উপর গির্জাটি অবস্থিত ছিল সেটির পাদদেশে কাফেলাটি একটি শুঙ্ক সালের ধারে অবস্থিত বড় গাছের কাছে থেকে গেল এবং তাঁরা সেখানে তাঁবু খাটালেন। সেই মুহূর্তে মেঘটিও থেমে গেল এবং শূন্য আকাশে মিলিয়ে গেল। মলয় বাতাসের দোলায় বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা এবং পত্র-পল্লব যেমন ঝুঁকে পড়ে ঠিক তেমনিভাবে ঝুঁকে পড়ে কাফেলার একজনের [মোহাম্মদ (সঃ)-এর উপর ছায়া বিস্তার করল এবং সেই ঘনছায়া প্রখর সূর্য-কিরণ থেকে তাঁকে রক্ষা করল। এসব অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখে বাহিরা অনুমান করলেন হেজায থেকে আগত কাফেলার মধ্যে রয়েছেন সেই মানুষটি যাঁর জন্যে তিনি এতকাল অপেক্ষা করে আসছেন। সেই নবী (সঃ) যাঁর আগমনবার্তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে আগেই ঘোষিত হয়েছে। বাহিরা তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে এলেন এবং ভাল খাবারের ব্যবস্থা করতে বললেন। তিনি একজন দূত পাঠিয়ে কাফেলার বালক, বৃদ্ধ, অভিজাত, দাস সবাইকে দাওয়াত দিলেন।

মক্কার অতিথিদের আগমনের জন্যে যে বাহিরা আগ্রহভরে মঠের প্রবেশপথে অপেক্ষা করছিলেন, দ্রুত তাঁদের নিয়ে সেখানে ফিরলেন। একজন মক্কাবাসী (অতিথিদের মধ্য থেকে) অবাক হয়ে বলে উঠলেন, “হে বাহিরা! আমি লাত ও উজ্জার নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনার আচরণ আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে; এর আগে বহুবার আপনার গির্জার পাশ দিয়ে গিয়েছি, কিন্তু কখনো আপনি আমাদের প্রতি কোন প্রকার মনোযোগ দেননি এবং আতিথেয়তার বিন্দুমাত্র লক্ষণও দেখানননি। আজ আপনাকে কোন বিকারে পেয়ে বসলো?” বাহিরা জবাবে বললেন, “আপনি ভুল বলেননি, আজ আমার এরকম করার যুক্তিসংগত কারণ আছে। কিন্তু এখন আপনারা আমার অতিথি। তাই আমি আশা করি, আমি আপনাদের সবার জন্যে যে খাবারের আয়োজন করেছি তাতে শরীক হয়ে আমাকে ধন্য করবেন।”

যখন নিয়ন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ নিদারুণ ক্ষুধা নিবারণের জন্যে খাবার গ্রহণ শুরু করেছেন, তখন বাহিরা প্রত্যেককে ভালভাবে পরখ করতে লাগলেন এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ব্যক্তিটিকে খুঁজে বের করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি সেই ব্যক্তিটিকে খুঁজে না পেয়ে দারুণভাবে হতাশ হয়ে পড়লেন। ধর্মগ্রন্থে যে ব্যক্তির কথা বর্ণিত ছিল সেই বর্ণনার সংগে তিনি কোন ব্যক্তির মিল খুঁজে পেলেন না। তাঁদের মধ্যে যে আল্লাহ’র নির্বাচিত প্রতিনিধি একজন অবশ্যই আছেন, একথা ভেবে তিনি আশ্বস্ত হলেন। তাই তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, “হে কোরাইশ বন্ধুগণ! আপনারা কি তাঁবুতে কাউকে রেখে এসেছেন?” তাঁরা প্রতিউত্তরে জানালেন, “হ্যাঁ একজন খুব অল্প বয়সী বালককে আমরা তাঁবুতে রেখে এসেছি। কিন্তু বাহিরা খুব আগ্রহভরে আবার প্রশ্ন করলেন, “আপনারা কেন তাঁকে এখানে নিয়ে এলেন না? যান, এখনই গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসুন, যাতে সে-ও আপনাদের সবার সাথে একসংগে খেতে পারে।” একজন কোরাইশ বললেন, “লাভ ও উজ্জার শপথ, আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোত্তালিবের পুত্র আমাদের সংগে থাকবে অথচ আমরা তাকে বাদ দিয়ে খাবো, এটা আমাদের জন্যে সত্যিই নিন্দনীয়।”

তিনি উটে চড়ে শিশু মোহাম্মদ (সঃ)-কে নিয়ে এসে মেহমানদের মাঝে হাজির করলেন। বাহিরা বালক মোহাম্মদ (সঃ)-কে গভীরভাবে এবং অতিথিদের খাদ্য গ্রহণ ও পানাহারের পর তিনি মোহাম্মদ (সঃ)-কে এক কোণায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে বৎস! আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাই। লাত ও উজ্জার দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি কি সঠিক জবাব দিবে?” লাত ও উজ্জার দোহাই দিয়ে বাহিরা মোহাম্মদ (সঃ)-কে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কারণ তিনি তাঁর অতিথিদের এই দুই দেবতার নামে শপথ করতে শুনেছিলেন। কিন্তু বালক মোহাম্মদ (সঃ) বললেন, “আমাকে লাত ও উজ্জার দোহাই দিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না। কারণ পৃথিবীতে এই দুই দেবতাকে যত ঘৃণা করি তার চেয়ে আমি আর কোন কিছুকেই অধিক ঘৃণা করি না।” বাহিরা বললেন, “ঠিক আছে, তবে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি আমার প্রশ্নের জবাব দেবে?” বালক মোহাম্মদ (সঃ) বললেন, “ঠিক আছে, প্রশ্ন করুন, আমি জবাব দেব।”

এরপর বাহিরা তাঁকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন; যেমন— তাঁর পরিবার, তাঁর সামাজিক অবস্থান, যেসব স্বপ্ন তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতো এবং আরও অনেক কিছু। তার পর মোহাম্মদ (সঃ) যখন ঐ জ্ঞানীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে তাঁর জামার কলার একটু ফাঁক হতেই ঐ ফাক দিয়ে বাহিরা তাঁর পিঠে দুই কাঁধের মাধখানে অংকিত ‘নবুয়তের মোহর’ দেখতে পেলেন। এর ফলে বাহিরার শেষ সন্দেহের অবসান হলো। বাহিরা অনুভব করলেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বালকই সেই নবী (সঃ) যাঁর আগমন-বার্তা ঘোষিত হয়েছে পবিত্র কিতাবসমূহে। এরপর বাহিরা উঠে গিয়ে আবু তালিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই বালক আপনার কি হয়?” আবু তালিব বললেন, “আমার ছেলে।” বাহিরা বললেন, “না, সে তো আপনার ছেলে নয়। “

আবু তালিব বললেন, “সে আসলেই আমার ছেলে নয়, তবে সে আমার ভাইয়ের ছেলে।”

বাহিরা বললেন, “আপনার ভাইয়ের কি হয়েছে?”

আবু তালিব বললেন, “এই ছেলে মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় আমার ভাই ইন্তেকাল করেছেন।”

বাহিরা বললেন, “এখন আপনি ঠিক বলেছেন। তাহলে আমার কথা শুনুন। আপনার ভাতিজাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যান। সবসময় তাঁর ওপর নজর রাখবেন। বিশেষ করে ইহুদিদের কাছ থেকে সাবধান থাকবেন। যদি তারা এই বালককে দেখে চিনতে পারে, যেমন আমি তাঁর পিঠের নিদর্শন দেখে চিনতে পেরেছি, – আল্লাহ্’র কসম, তারা ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কারণ আপনার এই ভাতিজাকে আল্লাহ্ নির্বাচিত করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহান ভূমিকা পালন করার জন্যে।”

আবু তালিব বাহিরার কথায় অভিভূত হলেন। সিরিয়ার বসরা নগরীতে তাঁর ব্যবসা বাণিজ্য সংক্ষিপ্ত করে তাড়াতাড়ি তিনি নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে বালক মোহাম্মদ (স:) কে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন।

মহান আল্লাহ্পাকের নিরাপদ আশ্রয়ে চাচা আবু তালিবের আন্তরিক পিতৃবৎ আদর-যত্নে বালক মোহাম্মদ (সঃ) বড় হতে লাগলেন এবং একজন মার্জিত রুচিসম্মত যুবকে পরিণত হলেন। তিনি স্বভাবে সর্বাধিক বিনয়ী ছিলেন। একবার আবু তালিব জমজম মেরামতের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তরুণ কোরাইশ বালকরা মোহাম্মদ (সঃ)-কে সাথে নিয়ে একটি বড় পাথর সেখানে সংযোজন করার জন্যে নিয়ে এলেন। ঐ পাথরের ধারালো কিনার থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনে ঐ সব ছেলেরা গায়ের জামা খুলে গলায় জড়িয়ে ফেলল। তাদের দেখাদেখি বালক মোহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর গায়ের জামা খুলে গলায় জড়ালেন। কিন্তু তিনি তাঁর নগ্ন দেহ অবলোকন করে এত বেশি লজ্জিত হয়ে পড়লেন যে তাঁর কপাল থেকে বড় বড় ঘামের ফোঁটা ঝরে পড়তে লাগল এবং একসময় তিনি লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে ভূমিতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।

পরের পর্বে আরও থাকছে…

Assalamu Alaikum! Hello world, I am Md. Hafijul Islam (mhihafijul). I am a Bangladeshi SEO expert. And I have been writing high quality Bengali content for a long time. I can write very nice SEO friendly articles. Along with that we do onpage seo, offpage seo and technical seo in proper guidelines. For which every article I write ranks on Google's fast page.

Sharing Is Caring:

Leave a Comment

error: Content is protected !!